IQNA

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের গৌরবময় অগ্রযাত্রার ৪১ বছর (পর্ব- নয়)

19:13 - February 10, 2020
সংবাদ: 2610204
ইরানে ইসলামী বিপ্লবের গৌরবময় অগ্রযাত্রার ৪১ বছর (পর্ব- নয়)
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লব সেই প্রথম থেকেই হতাশা ও জড়তার শিকার মুসলিম উম্মাহর মধ্যে জাগিয়েছিল প্রাণের স্পন্দন এবং এখনও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে।

বার্তা সংস্থা ইকনা'র রিপোর্ট: দেশে দেশে ইসলামী আন্দোলনগুলো ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠে এবং বিপ্লবী নেতা-কর্মীরা এই মহাবিপ্লবকে তাদের জন্য অনুপ্রেরণা ও এমনকি অনুকরণীয় আদর্শ বলেও স্বীকার করেছেন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত সুন্নি আলেম ও শিক্ষাবিদ মাওলানা মোহাম্মাদ উল্লাহ হাফেজজি হুজুর ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নানা দিকের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। ইরানি যুব সমাজের মধ্যে জিহাদের প্রতি প্রবল আকর্ষণ, নারী সমাজের ইসলামী শালীন পোশাক ও ইমাম খোমেনীর চালচলন আর ব্যক্তিত্বে মহানবীর (সা) প্রভাব তাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছিল। ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদি বলেছিলেন, ইরানের ইসলামী বিপ্লব আমার হৃদয়ের স্পন্দন। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ও ইসলাম ধর্ম প্রচারক মরহুম আহমাদ দিদাত তার ইরান সফরের স্মৃতিচারণে বলেছিলেন,

'ইমাম এলেন, তার থেকে দশ মিটার মত দূরে ছিলাম আমি; আমি ইমামকে দেখলাম। তিনি আমাদেরকে প্রায় আধা ঘণ্টার একটি লেকচার দিলেন, আর কুরআনের বাইরে এতে কিছু ছিল না। এই মানুষটা যেন কম্পিউটারাইজড এক কুরআন। আর তিনি যখন পাশের একটা রুম থেকে হেঁটে এসে ভিতরে ঢুকলেন, সবার উপর তাঁর যে প্রভাব, তাঁর যে কারিশমা – বিস্ময়কর ! তাঁর দিকে তাকানোর সাথে সাথে কোনো ভাবনা ছাড়াই চোখের কোল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। আপনি তাঁর দিকে তাকান : আপনার চোখ অশ্রুসজল হয়ে যাবে। এর চেয়ে বেশি সুদর্শন বৃদ্ধ মানুষ আমি জীবনে কখনো দেখিনি। কোনো ছবি, ভিডিও বা টিভি তাঁকে উপযুক্তভাবে তুলে ধরতে পারবে না : আমার সারা জীবনে দেখা সবচেয়ে হ্যান্ডসাম মানুষ হলেন তিনি।

ইরানে ইসলামী বিপ্লব হওয়ার পর কেউ কেউ ভেবেছিলেন এই বিপ্লব হয়ত মানবীয় শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং কল্যাণমূলক মুক্ত চিন্তার চর্চাকে নিষিদ্ধ করবে। কিন্তু তাদের এই ধারণা পুরোপুরি ভুল বলে প্রমাণ করেছে ইসলামী ইরান। ইসলামী ইরান অপসংস্কৃতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেও নাটক, সাহিত্য, সিনেমা বা চলচ্চিত্রকে নিষিদ্ধ করেনি, বরং হয়ে উঠেছে বিশ্বের সেরা সৃজনশীল ও আর্ট-ফিল্ম, নাটক ও সাহিত্য রচনার কেন্দ্র। ইরানি চলচ্চিত্র সেক্স, ক্রাইম ও ভায়োলেন্স-নির্ভর না হয়ে হয়ে উঠেছে মানবীয় ও ধর্মীয় মূল্যবোধগুলোকে তুলে ধরার উৎকৃষ্ট মাধ্যমে। পবিত্র কুরআনের কাহিনী ও ইসলামের সংগ্রামী ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে-ধরা বেশ কয়েকটি ইরানি চলচ্চিত্র বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এসবের মধ্যে ইউসুফ-নবী (আ), পবিত্র নারী মারিয়াম, মর্দানে অ্যাঞ্জেলুস তথা আসহাবে কাহাফ, মোখতারনামেহ, ইমাম আলী (আ), সাফির বা ইমাম হুসাইনের (আ) দূত এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল (সা) শীর্ষক ছায়াছবিগুলোর কথা উল্লেখ করা যায়। ইসলামী ইরানের বহু ছায়াছবি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে। দু'টি ইরানি ছায়াছবি সিনেমার নোবেলতুল্য পুরস্কার হিসেবে খ্যাত অস্কার পুরস্কারও পেয়েছে।

ইরানের ইসলামী বিপ্লব কবিতাসহ সৃজনশীল নানা সাহিত্যের বিকাশেও গৌরবময় ভূমিকা রাখছে। উচ্চতর মানবীয় মূল্যবোধ ও ইসলামের বিশ্বজনীন বাণী এবং সাম্রাজ্যবাদ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও বিপ্লবের অনুপ্রেরণা ইরানের ইসলামী বিপ্লবোত্তর কাব্য ও কবিতায় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। ইরানের অনেক প্রখ্যাত কবি আধুনিক স্টাইলের কবিতা লেখায় দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও ঐতিহ্যবাহী ধারার গজল ও কবিতা লেখাও অব্যাহত রেখেছেন।

ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের কার্টুনিস্ট ও চিত্রশিল্পীরাও নানা ধরনের জরুরি বিষয়ে সাড়া-জাগানো কার্টুন ও চিত্র-শিল্প উপহার দিয়ে যাচ্ছেন। ডেনমার্কে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)'র প্রতি অবমাননাকর কার্টুন প্রকাশের জবাবে ইরান সাম্রাজ্যবাদী ও ইহুদিবাদ-বিরোধী কার্টুন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। এ ছাড়াও ইসলামী ইরান মুসলিম বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত গবেষণা জোরদারের লক্ষ্যে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (সা)'র নামে একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রবর্তন করেছে।

ইরানের ইসলামী বিপ্লব দেশটিতে বাক-স্বাধীনতার প্রতিও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি কখনও। গঠনমূলক সমালোচনাকে সব সময়ই স্বাগত জানিয়ে এসেছেন ইসলামী ইরানের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ। ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী প্রধান তথা প্রেসিডেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্টের নানা কাজের সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন। সরাসরি এভাবে প্রতিবাদ জানানোর ও সমালোচনা করার সুযোগ পশ্চিমা বিশ্বের কথিত অনেক উন্নত দেশেও দেখা যায় না। ইরানের সংবাদপত্র ও সংবাদ মাধ্যমেও সরকারের কঠোর সমালোচনামূলক বক্তব্য ও মন্তব্য দেখা যায়। এমনকি নাটক ও টেলিভিশন সিরিয়ালেও এ ধরনের সমালোচনা দেখা যায়।

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর দেশটির বই শিল্পও অনেক উন্নত হয়েছে এবং ইরানিদের মধ্যে বই পড়ার প্রবণতাও বিশ্বের অন্য অনেক দেশের চেয়ে বেশি। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার গুরুত্বপূর্ণ নতুন বইগুলো প্রকাশ হওয়ার পরপরই বা খুব শিগগিরই সেগুলো ইরানের রাষ্ট্রভাষা ফার্সিতে অনূদিত হয়।

মোটকথা ইরানের ইসলামী বিপ্লব দেশটিতে কোনো ধরনের ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি ও অজ্ঞতার ধারা সৃষ্টি করেনি, বরং ইসলামী মূল্যবোধের ক্ষেত্রে কোনো আপোষ না করেও সৃষ্টি করেছে মানবীয় সৃজনশীলতা ও ইসলামী উদারতার অফুরন্ত-প্রাণ-প্রবাহ। ফলে বিশ্বের শিক্ষিত সমাজ ও অনেক অমুসলিম বুদ্ধিজীবীর কাছেও এ বিপ্লব ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ ও প্রচারের মাধ্যম হয়ে দেখা দিয়েছে।

সূত্র: parstoday

captcha