IQNA

0:02 - November 24, 2020
সংবাদ: 2611861
তেহরান (ইকনা): সোমালি জঙ্গি গোষ্ঠি আল-শাবাব তাদের মতাদর্শের জন্য হাজার হাজার মানুষকে যোদ্ধা হিসেবে দলে টানে। কিন্তু যেসব এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে, সেখানে নানা সরকারি সেবা চালানোর জন্যও তাদের অনেক লোক দরকার হয়।

কেউ দলত্যাগ করার চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়লে তাকে মেরে ফেলা হয়। কিন্তু সোমালিয়ার সরকার আবার আল-শাবাবের লোকজন যেন দলত্যাগ করে সেজন্যে উৎসাহ দেয়, তাদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র চালায়, যাতে তারা আবার সমাজে ফিরে আসতে পারে। অন্ধকার একটি কক্ষে আমার উল্টোদিকে ওরা তিনজন বসে ছিল।

বাঁয়ে ইব্রাহিম। তার চোখের দৃষ্টিতে আত্মবিশ্বাস। সানগ্লাসটি পরণের পোলো শার্টে বুকের কাছে গুঁজে রাখা। কব্জিতে পরা একটি বড় হাতঘড়ি। মাথায় পরা বেইজবল ক্যাপের নিচে জ্বল জ্বল করছে তার বাদামি চোখ।ইব্রাহিম জানায়, ওর বয়স ৩৫।

মাঝখানের জনের নাম মৌলিদ। দেখতে শুকনো-পাতলা। তারা গায়ে হলুদ শার্ট, তার সঙ্গে মিলিয়ে পায়ে হলুদ স্যান্ডেল। ওর বয়স ২৮।

আর সবার ডানে আহমেদ। সুন্দর করে ছাঁটা দাড়ি। মাথায় জড়ানো কেফাইয়া স্কার্ফ। গায়ে আকাশ-নীল রঙা শার্ট, তার নিচে উঁকি দিচ্ছে একই রঙের টি-শার্ট। আহমেদের বয়স ৪০। ওদের একটা অভিযোগ আছে।

এখানে সকালবেলা যে নাশতা খেতে দেয়া হয়, সেটা ওদের পছন্দ নয়। মোগাদিসুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাঁটাতারের বেড়ার পেছনে একটা নিরাপদ আস্তানায় ওদের রাখা হয়েছে।

"প্যানকেক, সিমের বিচি, এগুলো আমাদের স্বাভাবিক খাবার নয়। আমরা বোতলের পানি খাই না। আমরা সহজ জীবন পছন্দ করি, প্রাকৃতিক পানি খেতে পছন্দ করি," বললো আহমেদ।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই বিমানবন্দরে নানা দেশের মানুষের কথা ভেবে এরকম খাবারই দেয়া হয়। এখানে পিৎজা, স্টেক, বিয়ার - সবই আছে। নেই কেবল সোমালি খাবার।

আমি এই তিনজনকে বললাম, তাদের আসল নাম আমি ব্যবহার করতে চাই না। তাদের ছবিও আমি তুলবো না। এমন কিছু আমি আমার রিপোর্টে লিখবো না যেটার কারণে তাদের বিপদে পড়তে হতে পারে। অথবা যেটা নিয়ে কথা বলতে তারা অস্বস্তি বোধ করতে পারে। ইব্রাহিম আমাকে থামিয়ে দিল।

"আমরা আমাদের কাহিনি বলতে ভয় পাই না। যা খুশি জিজ্ঞেস করতে পারো। আমাদের ছবিও তুলতে পারো। আমাদের আসল নামও বলতে পারো।"

কিন্তু তারপরও আমি ঠিক করলাম এদের কোন ছবি তুলবো না, তাদের প্রকৃত নাম ব্যবহার করবো না। কারণ আমার আশংকা, এতে ওদের জীবন বিপন্ন হতে পারে।

কারণ এরা সবাই আল-শাবাব নামের একটি জঙ্গি ইসলামিক গোষ্ঠী ছেড়ে পালিয়ে এসেছে। এই গোষ্ঠী গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সোমালিয়ায় সক্রিয়। তারা দেশটির বিরাট এক অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। সেখানে তারা কঠোর সব নিয়ম-কানুন এবং সাজা চালু করেছে। আল-শাবাব তাদের এলাকায় সমান্তরাল এক শাসনব্যবস্থা চালায়। তাদের মন্ত্রণালয় আছে, পুলিশ আছে, নিজস্ব বিচার ব্যবস্থা আছে। সেখানে তারা স্কুল চালায়, স্বাস্থ্য কেন্দ্র চালায়। ফসলের ক্ষেতে তারা সেচ দেয়। রাস্তাঘাট, সেতু সংস্কার করে। আর এসব কাজ করার জন্য তাদের অনেক লোক দরকার হয়।

আল-শাবাব দলত্যাগীদের ক্ষমা করে না

কেউ যদি তাদের দল ছেড়ে পালায়, তার শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। আল-শাবাব আমাকে জানিয়েছে, এই শাস্তি কেবল তাদের যোদ্ধাদের জন্য নয়, যে কেউ অনুমতি ছাড়া তাদের দল ছাড়লে একই শাস্তি তাদের জন্যও।

"আমি আল-শাবাবে যোগ দিয়েছিলাম একটি মাত্র কারণে, অর্থের জন্য", বললো আহমেদ। তিন জনের মধ্যে ও সবচেয়ে বেশি সোজাসাপ্টা কথা বলে।

"ওরা আমাকে দুই/তিনশো ডলার দিত। ওরা আমাদের এলাকায় যে পরিবহন ব্যবস্থা চালাতো, আমি ছিলাম সেটার দায়িত্বে।"

ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে টাকার ইঙ্গিত করে ইব্রাহিম বললো, "আমিও টাকার জন্যই যোগ দিয়েছিলাম। তিন বছর ধরে ওদের যোদ্ধা হিসেবে কাজ করেছি। একবার এটাতে ঢুকে গেলে তুমি মজা পেয়ে যাবে।"

"তবে আল-শাবাবের যে জিনিসটা আমার পছন্দ হয়নি, সেটি হলো যেভাবে ওরা আমার মানসিকতা বদলে দেয়ার চেষ্টা করছিল। প্রতি তিন মাসে ওরা আমাদের মগজ ধোলাই করার জন্য একদল লোক পাঠাতো। ওরা আমাদের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে কুরআন তেলাওয়াত করতো। এরপর বার বার করে বলতো- সোমালিয়ার সরকার, আফ্রিকান ইউনিয়ন এবং তাদের আন্তর্জাতিক সমর্থক- এরা সবাই কাফের। ধর্মত্যাগী মুরতাদ। ওরা এমনভাবে কথা বলতো, যেন আমাদের মগজের মধ্যে আল-শাবাবের সিম-কার্ড ঢুকিয়ে দিচ্ছে।"

মাথায় যেন আল-শাবাবের সিম-কার্ড ঢুকিয়ে দেয়া হয়

এই তিন জন বলছে, তাদের মনে হয়েছিল, এরকম মগজ ধোলাইয়ের ফলে তাদের মন বেঁকে যেতে শুরু করেছে। একসময় তাদের উপলব্ধি হলো, আল-শাবাব আসলে বিশুদ্ধ বা আরও ভালো ইসলামের জন্য লড়ছে না। তারা লড়ছে এক বিকৃত, বিপথগামী ইসলামের জন্য। কাজেই আল-শাবাবের কাছ থেকে অর্থ পেলেও তাদের আর মন টিকছিল না।

কিন্তু আল-শাবাব ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নিতে তারা ভীষণ ভয় পাচ্ছিল। শুধু পালালেই তো হবে না, এরপর তাদের আল-শাবাব নিয়ন্ত্রিত বিস্তীর্ণ এলাকা পাড়ি দিয়ে সেখান থেকে বেরুতে হবে। "শুরুর দিকে আমি কেবল রাতে হাঁটতাম। আমার পা কাঁটায় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গিয়েছিল‍," বলছিল আহমেদ।

"তবে ভাগ্য ভালো, আমার সঙ্গে আমার ফোনটা ছিল। আমি আমার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছিলাম। আমি বিশ্বাস করতে পারি, এরকম একজন লোককে ওরা পাঠালো। সেই লোক আমাকে একটা নিরাপদ এলাকায় নিয়ে গেল। এতে বহুদিন লেগেছে। প্রতিটা পদক্ষেপে আমি থাকতাম ভয়ে ভয়ে। আমাকে পথে থামিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, প্রকাশ্যে হত্যা করা হবে, এরকম একটা আতংক আমাকে গ্রাস করেছিল। দলত্যাগীদের আল-শাবাব এভাবেই হত্যা করে।"

পালাতে হয়েছিল রাতের আঁধারে

তবে আতংক শুধু এদিকে নয়, আল-শাবাবের এলাকা ছেড়ে অন্যদিকে যাওয়ার পর সেখানে কী ঘটবে, সেটা নিয়েও ভয় কম নয়। আল-শাবাবের এক বড় নেতা জানিয়েছিল, দলত্যাগীরা যদি সোমালিয়ার নিরাপত্তা বাহিনির হাতে ধরা পড়ে, তাদেরকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে মেরে ফেলা হয়।

সোমালিয়ার সরকার যে দলত্যাগীদের জন্য সাধারণ ক্ষমা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা চালু করেছে, সেটা বেশিরভাগই জানতো না। তাদের যে নতুন করে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ দিয়ে সমাজে ফেরানোর কর্মসূচি নেয়া হয়েছে, সেটি ছিল তাদের অজানা।

দলত্যাগীদের জন্য এসব কর্মসূচির কথা প্রচারের কিছু প্রচেষ্টা চলছে। রঙিন লিফলেট ছাপানো হয়েছে। যারা পড়তে পারে না তাদের কথা ভেবে কিছু লিফলেটে ছবি দেয়া হয়েছে, যাতে দেখা যায় আল-শাবাবের সদস্যদের উদ্ধার করা হচ্ছে। লিফলেটে ফোন নম্বর দেয়া আছে, যে নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে। সরকারের এসব প্রচেষ্টার ফলে আল-শাবাব ছেড়ে পালানো মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এবছরের প্রথম দুই মাসেই ৬০ জন আল-শাবাব সদস্য দলত্যাগ করেছে।

আল-শাবাব ছাড়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে তৈরি লিফলেট

ইব্রাহিম আল-শাবাবের সঙ্গে ছিল তিন বছর। তবে দল ছেড়ে পালানোর সিদ্ধান্ত নিতে তার সময় লেগেছে দুই মাস। ইব্রাহিম জানায়, সে কখনোই তার নিজের গ্রামে ফিরে যাবে না। মোগাদিসুর মতো বড় শহরের মানুষের ভিড়ে সে বাকী জীবনের জন্য মিশে যেতে চায়। নইলে আল-শাবাব তাকে খুঁজে বের করে হত্যা করবে।

এদের তিনজনই এখন রাজধানী মোগাদিসুর একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকে। এটির নাম সেরেনডি। এদের জীবনের ওপর হুমকি এত বেশি যে, আমি যখন সেখানে যাই, তখন দেখি ৮৪ জন দলত্যাগীকে পাহারা দেয়ার জন্য এই কেন্দ্রে মোতায়েন আছে ৮০ জন নিরাপত্তা রক্ষী।

আল-শাবাবের যারা উর্ধ্বতন সদস্য, তাদের এই কেন্দ্রে আনা হয় না। তাদের জন্য আছে আলাদা একটি কর্মসূচী। কারণ তাদেরকে খুবই বিপজ্জনক বলে মনে করা হয়। সেরেনডি হচ্ছে আল-শাবাব ছেড়ে আসা নিচের স্তরের সদস্যদর জন্য- মাঠের যোদ্ধা, মালামাল বহনকারী, মেকানিক এবং এধরনের লোকজনের জন্য।

সেরেনডিতে কাউকে আনার আগে তাদেরকে সোমালিয়ার ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স এন্ড সিকিউরিটি এজেন্সি ভালোমতো পরীক্ষা করে দেখে। দলত্যাগীরা স্বেচ্ছায় এসেছে কীনা এবং আল-শাবাবের আদর্শ আসলেই পরিত্যাগ করেছে কীনা, সেটা বোঝার জন্য।

কিন্তু মোগাদিসুর এক সাংবাদিক আমাকে জানালেন, আল-শাবাবের কিছু সক্রিয় সদস্য এসব পরীক্ষা ফাঁকি দিয়ে সেরেনডিতে ঢুকে পড়তে পেরেছিল, এবং সেখান থেকে তাদের দলের কাছে বার্তা পাঠাতে পেরেছিল।

সেরেনডিতে যে পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু আছে, তার লক্ষ্য দলত্যাগীদের শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিকভাবে পুনর্বাসন করা। তাদের এমন কিছু দক্ষতা অর্জনে প্রশিক্ষণ দেয়া, যাতে তারা আবার ধীরে ধীরে বাইরের জীবনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। হয় তাদের নিজেদের সমাজে, বা অন্য কোথাও।

"আমি যখন আল-শাবাবে ছিলাম, তখন একটা সশস্ত্র পিকআপ ট্রাক চালাতাম। এটাকে আমরা বলতাম ভলভো। আমার কোন কিছুতেই ভয় করতো না," বলছিলেন মৌলিদ।

"যখন আমি সেরেনডিতে আসলাম, আমার সুপারভাইজার দেখলো আমি খুব ভালো একজন ড্রাইভার। আমি তখন ক্যাম্পে ড্রাইভিং প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করলাম। আমি অন্য দলত্যাগীদের ড্রাইভিং শেখাতাম। এখন আমি একটি স্কুল বাসের ড্রাইভার হিসেবে কাজ করি। একদিন আমি আমার নিজের ট্রান্সপোর্ট ব্যবসা শুরু করতে চাই।" আহমেদ এখন জমি কেনা-বেচার কাজ করে জীবিকা চালান।

ইব্রাহিম আমাকে জানালো, সেরেনডিতে সে কীভাবে নাপিতের কাজ শিখেছে। এই কাজে সে এতটাই ভালো করছিল যে ক্যাম্পেই অন্যদের চুল কেটে সে অর্থ কামাতে শুরু করলো। ইব্রাহিম এখন মোগাদিসুতে একটা চুল কাটার সেলুন খুলেছে। তার অধীনে কাজ করে তিনজন।

"আমার দুই স্ত্রী আর আট সন্তানের খরচ চালানোর জন্য যথেষ্ট টাকা আমি উপার্জন করি।" ইব্রাহিম জানালো, পরিবারের সবাইকে এখন সে মোগাদিসুতে নিয়ে এসেছে এক সঙ্গে থাকবার জন্য।

চুল কাটার সেলুন

কিন্তু আল-শাবাব ছাড়ার পর জীবন অতটা সহজ নয়। মৌলিদ জানায়, তার পরিবারের কেউ কেউ তাকে মেনে নেয় নি। অন্যরা তাকে এখনো বিশ্বাস করে না।

ইব্রাহিম বলছে, সে আর কখনো তার নিজের সমাজে ফিরে যেতে পারবে না। তাকে খুঁজে বের করে হত্যার ঝুঁকি যদি নাও থাকে, তারপরও নয়। যদিও তার নিজের পরিবার তাকে ক্ষমা করে দিয়েছে। তার প্রতিবেশিরা অবশ্য ক্ষমা করেনি। তবে আল-শাবাবের দিনগুলোর ক্ষত এখনো রয়ে গেছে তার মনের গভীরে যা তাকে এখনও তাড়া করে।

"আমি আমার মগজ থেকে আল-শাবাবের সিম-কার্ডটা বের করতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছি। যেসব খারাপ কাজ আমি করেছি, আর আমার সঙ্গে যেসব খারাপ ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর ছবি হঠাৎ হঠাৎ আমার চোখে ভাসে। আমাকে তাড়া করে।"

সেরেনডির ভেতরে একটা ক্লাশরুমে আল-শাবাব ছেড়ে পালিয়ে আসা লোকজনকে নানা বিষয় শেখানো হয়। মৌলিক স্বাক্ষরজ্ঞান, ইংরেজি, অংক এবং অন্যান্য বিষয়। কেউ কেউ কারিগরি বিদ্যা, আইটি, ড্রাইভিং এবং অন্যান্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেয়।

আরেকটি বড় রুমে শেখানো হয় সেলাইয়ের কাজ। সেখানে শিক্ষানবিশ দর্জিরা রঙ-বেরঙের কাপড় দিয়ে ড্রেস বানায়। তারপর সেলাই করা এসব কাপড় দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হয়। আল-শাবাব নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নারীদের ভারী আলখেল্লা এবং হিজাব পরতে হয়। মূলত কালো বা তার কাছাকাছি রঙের।

করোনাভাইরাসের মহামারি শুরু হওয়ার পর সেরেনডির এই সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ফেইস মাস্কও তৈরি করা হচ্ছে বাইরে বিতরণের জন্য।.

সেরেনডির ডরমিটরিতে বিশ্রাম নিচ্ছিল কয়েকজন তরুণ। সেখানে সারি সারি বিছানা। প্রতিটি বিছানার পায়ের কাছে একটি করে বড় লকার, যেখানে জিনিসপত্র তালা দিয়ে রাখা যায়।

আরেকটি রুম থেকে জোরে জোরে গান বাজছে। দুইজন সেখান গান গাইছিল আর নাচছিল। আল-শাবাবের এলাকায় এই কাজ একেবারে নিষিদ্ধ ছিল। তবে নাচতে নাচতে তারা মাঝে মধ্যে সামরিক কায়দায় কুচকাওয়াজও করছিল, যেমনটা দেখা যায় আল-শাবাবের রিক্রুটমেন্ট ভিডিওতে। মনে হচ্ছে যেন এরা তাদের অতীতকে এখনো ঝেড়ে ফেলতে পারছে না।

সেরেনডিতে একজন পেশাদার ফুটবল কোচ আসে। আল-শাবাবের দলত্যাগী সদস্য, ক্যাম্পের কর্মী এবং রক্ষীদের নিয়ে সেখানে ফুটবল মাঠে খেলা হয়।

এদের যাতে জঙ্গি আদর্শ থেকে ফিরিয়ে আনা যায় সেজন্যে নিয়মিত ক্যাম্পে আসেন ইমাম এবং ধর্মীয় নেতারা। তারা বোঝান, আল-শাবাব যে ইসলামের কথা তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে, তার চাইতে ভিন্ন এক ইসলামও কিন্তু আছে।

.সেরেনডির কর্মকর্তারা জানান, এখানে লোকজনকে রাজনীতির ব্যাপারেও শিক্ষা দেয়া হয় যাতে এরা সরকার সম্পর্কে একটা ইতিবাচক ধারণা পেতে পারে।

এখানে কিছুদিন সময় কাটানোর পর দলত্যাগীদের সপ্তাহান্তে বাইরে ছুটি কাটানোর সুযোগ দেয়া হয়। অনেকে বাইরে গিয়ে পড়াশোনা বা কাজ করতে পারে, তবে বিকেলে আবার ক্যাম্পে ফিরে আসে।

ক্যাম্পের ভেতরে একটি দুই শয্যার ক্লিনিকও আছে। সেখানে টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, অপুষ্টি, হেপাটাইটিস বা এরকম অন্য কোন রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। দলত্যাগীদের মধ্যে সিফিলিসের প্রকোপ বেশি। অনেকে যখন এখানে আসে, তখন দেখা যায় তারা তীব্র পানিশূন্যতায় ভুগছে। কারও শরীরে হয়তো বুলেটের দাগ, শরীরের ভেতরে রয়ে গেছে বুলেট।

তবে সেরেনডি এখন যেরকম সুষ্ঠুভাবে চলছে বলে মনে হয়, সব সময় তা ছিল না। এটি স্থাপন করা হয়েছিল ২০১২ সালে। শুরুতে এটি ঠিকমত চালানো যাচ্ছিল না। মাঝে অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, এখানে এসেছিল যে দলত্যাগীরা, তারা আল-শাবাবে তাদের সহযোদ্ধাদের কাছে বার্তা পাঠাচ্ছিল, তারা যেন একই কাজ না করে, যেন এখানে না আসে।

তবে এখন এটি অনেক ভালোভাবে চলছে। দলত্যাগীদের স্ত্রীদের জন্যও এখন পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে। এদের অনেকে আল-শাবাবের এলাকায় গিয়ে তাদের স্বামীদের সঙ্গে থাকতো। অনেকে আবার আল-শাবাবের সক্রিয় সদস্য ছিল।

দুবছর আগে সেরেনডি ছেড়ে গেছে এমন একজনের সঙ্গে আমার দেখা হলো। তার নাম বশির। পরিপাটি পোশাক পরা বশির মৃদুভাষী।

বশিরকে দেখে বোঝা মুশকিল, এরকম ভদ্র একজন মানুষ কীভাবে আল-শাবাবের মতো সহিংস গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছিল।

নানা কাজের প্রশিক্ষণ দেয়া হয় সেরেনডি ক্যাম্পে

"আমি যখন যোগ দেই, তখন আমি কিশোর। আল-শাবাব আমাকে বলেছিল আমি তাদের মেডিক্যাল টিমে সাহায্য করতে পারি। তাদের না বলার সাহস আমার ছিল না। আর আমার অর্থের খুব দরকার ছিল। তারা আমাকে মাসে ৭০ ডলার করে দিত," বলছিল বশির।

সেরেনিডি থেকে চলে আসার সময় বশির আড়াইশো ডলার পেয়েছিল। সেই টাকা দিয়ে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। একটা ছোট্ট ফার্মেসিও দিল।

"আমি সেখানে আইসক্রিমও বিক্রি করি।" তবে বশির এখনো আতংকে আছেন। "প্রতিদিনই আমার ভয় করে যে আল-শাবাব আমাকে খুঁজে বের করবে।"

এরকম আশংকার ভিত্তি আছে। আল-শাবাব মোগাদিসুতেও নিয়মিত লোকজনকে হত্যা করে। শহরের লোকজন জানায়, আল-শাবাবের লোক আছে সর্বত্র। তারা মানুষের কাছ থেকে চাঁদা নেয়, তারা ত্রাণ বিতরণ করে এবং যেসব এলাকায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ শিথিল, সেখানে তারা লোকজনকে সাজাও দেয়।

শুরুর দিকের কিছু সমস্যা সত্ত্বেও আল-শাবাব ছেড়ে পালানো নিচের ধাপের লোকজনের বেলায় এই পুনর্বাসন কর্মসূচি কাজ করছে বলেই মনে হয়। সেরেনডির কর্মকর্তারা জানান, এই কর্মসূচি শেষ করা শত শত লোকের মধ্যে কেউ আবার আল-শাবাবে ফিরে গেছেন, এমনটি তাদের জানা মতে ঘটেনি।

সেলাই কাজের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে ক্যাম্পে

তবে আল-শাবাবের এখনো রয়েছে হাজার হাজার সদস্য। তারা এখনো সোমালিয়ায় এবং সোমালিয়ার বাইরে সন্ত্রাসবাদী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির প্রাণকেন্দ্রে এক শপিং মলে পর্যন্ত তারা হামলা করেছে। মোগাদিসুতে তারা ট্রাক বোমা দিয়ে বড় বড় হামলা চালায়, হত্যা করে শত শত মানুষ।

ইব্রাহিম, মৌলিদ, আহমেদ এবং বশির- এরা সবাই এখন নতুন করে তাদের জীবন শুরু করেছে। আল-শাবাব থেকে মুক্ত হতে পেরে যেন মনে হচ্ছে তারা ভারমুক্ত। তবে তাদের মতো আরও শত শত মানুষকে আল-শাবাব থেকে বের করে সেরেনডির মতো কেন্দ্রে আসার জন্য রাজী করানোটাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্র: abnews24

নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য:
* captcha: