IQNA

23:06 - October 11, 2021
সংবাদ: 3470801
ব্রিটেনেরদ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার (গতকাল রোববার ১০ অক্টোবর ২০২১) এ প্রবন্ধে ব্রিটেনের জ্বালানি তেল সরবরাহ সংকট সহ আরো বহুমুখী সংকট নিয়ে বিশ্লেষণ মূলক প্রবন্ধ : ব্রিটিশ অর্থনীতির উপর (বিদ্যুত-গ্যাস) বিল থেকে শুরু করে কেনাকাটা (শপিং)-পেট্রল (জ্বালানি তেল সরবরাহ সংকট) সহ ৬ ধরণের নিংড়ানো চাপ :

তেহরান (ইকনা): ব্রিটেনে ১০০০০০ লরি বা ট্রাক ড্রাইভারের ঘাটতি রয়েছে ; এনার্জি ফার্ম সমূহ ডুবে যাচ্ছে (দেউলিয়া হচ্ছে) , খাবার দাবার (খাদ্য দ্রব্য) দুষ্প্রাপ্য হয়ে যাচ্ছে এবং বহুমুখী সংকট সমূহের উদ্ভব হওয়ার কারণে নিয়োগদাতারা (employers ) (দক্ষ)কর্মচারীদের সন্ধান করছেন (তারা কাজ করার লোক অর্থাৎ  employees কে খুঁজে পাচ্ছেন না অর্থাৎ ব্রিটেনে দক্ষ জনশক্তির অভাব দেখা দিয়েছে। ২মিলিয়ন চাকরি খালি রয়েছে)

ব্রিটিশ অর্থনীতির উপর ঐ ছয়টি নিংড়ানো চাপ হচ্ছে :

১. সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় বিভ্রাট,

২. পেট্রল (জ্বালানি তেল সংকট),

৩. গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল (বৃদ্ধি),

৪. শিল্প,

৫. রিটেইল ( খুচরা বিক্রি : মুদি দোকান ও চেইন স্টোর সমূহের শেলগুলো খালি পড়ে থাকা),

৬.শূন্য পদ ও চাকরি খালি থাকা (দক্ষ কর্মচারী ও  জনশক্তির স্বল্পতা ও অভাব : প্রায় ২০ লক্ষ চাকরি খালি বা ভ্যাকান্ট থাকা)।

এ পর্যন্ত ব্রিটেনের ১২ টি এনার্জি ফার্ম দেউলিয়া হয়ে গেছে।  এই অক্টোবর মাসেই ব্রিটেনে গড়ে ১৩৯ পাউন্ড করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল বৃদ্ধি পেয়েছে এবং যদি প্রাকৃতিক গ্যাসের পাইকারি মূল্য না কমে তাহলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল আরো বাড়বে। কাস্টমার দেরকে বিল বাবদ প্রতি বছর ৬০০ পাউন্ড পর্যন্ত বেশি দিতে হতে পারে। আর নেচারাল এনার্জি অ্যাকশন গত সপ্তাহে সতর্ক করে দিয়েছেন যে যে সব পরিবার (শীতকালে) তাদের বাড়ীঘর গরম রাখার জন্য (দারিদ্র্যের কারণে রীতিমত)

সংগ্রাম করছেন তাদের সংখ্যা ১৫ লক্ষ থেকে ৫৫ লক্ষ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে!

 লজিস্টিক ইউকে অনুযায়ী: ব্রিটেনে শুধু ১০০০০০ ট্রাক ড্রাইভারের অভাব নয় বরং ৯৬% পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে নিয়োগ দান জনিত বিভিন্ন সমস্যাও রয়েছে। ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে গোডাউন  (ওয়ার হাউজ) , কর্মচারী (স্ট্যাফ), ভ্যান চালক,  মেকানিক, টেক্নিসিয়ান, লিফ্ট্রাক চালক এবং ট্রান্সপোর্ট  ম্যানেজারেরও অভাব ও স্বলপতা রয়েছে। ১৯০০০ HGV ড্রাইভার ব্রিটেন ত্যাগ করেছে।

গ্যাস বিল সমূহ ব্যবসায়ের জন্য ধার্য  করা হয় নি যা গত মাসে (সেপ্টেম্বর ২০২১) সার তৈরির কারখানা সমূহ বন্ধ হওয়ার কারণ হয়েছে এ জন্য যে তা কার্বন ডাইঅক্সাইড ঘাটতির কারণ ঘটিয়েছে। ইস্পাত, কাঁচ, কাগজ, সিরামিকস এবং অন্যান্য ভারী শিল্প নির্মাতা শিল্প উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে যার অর্থ হতে পারে বেশ কিছু প্ল্যান্ট (শিল্প কলকারখানা) স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া।

খুচরা কেনাকাটা : ব্রিটেনে মুদি দোকান ও সুপার মার্কেট সমূহে শেলফসমূহ খালি হয়ে যাচ্ছে। জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের রিপোর্ট অনুযায়ী ব্রিটেনে প্রতি ৬ জন পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তির মধ্যে একজন নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী (ফুড আইটেমস) কিনতে অপারগ হয়ে গেছে। আর ব্রিটেনের জনগণের প্রায় এক চতুর্থাংশ (২৫%) প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী ছাড়া আর কিছু কেনার আর্থিক সামর্থ্য রাখে না। ব্রিটেনের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা সমাধানের জন্য অপেক্ষমান। সরকার একজন সাপ্লাই চেইন অ্যাডভাইজার নিযুক্ত করেছেন। কিন্তু রসদপত্র সরবরাহ কারী প্রতিষ্ঠানসমূহের বিশ্বাস হচ্ছে যে ক্রিসমাস বা বড় দিনের কাছাকাছি সময় এ সব সমস্যা ও সংকট আরো তীব্র ও ভয়াবহ হবে।

চাকরি খালি থাকা (job vacancies ) : ইত্যবসরে ব্রিটেনে প্রায় ২০ লাখ চাকরি খালি থাকার কারণে নিয়োগ দাতারা (employers ) ক্রিসমাস বা বড় দিনের কেনাকাটা ও ব্যবসা বাণিজ্যের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রায় ১০০০০০ অস্থায়ী কর্মচারী খোঁজা শুরু করেছেন ; আর রাজকীয় ডাক বিভাগ (রয়াল মেইল), টেস্কো , সেইন্সবারিয্, আমাযোন, মরিসন্স এবং জন লুইসের মতো প্রতিষ্ঠান সমূহ কর্মচারী খুঁজছেন!!

( এ সব বৃহৎ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানও কর্মচারী স্বল্পতার সমস্যায় ভুগছে !!)

দ্য গার্ডিয়ানের এ প্রবন্ধ ও রিপোর্ট (Analysis: six squeezes on the UK economy from bills to shopping to petrol) থেকে প্রতীয়মান হয়ে গেছে ব্রিটেনের লেজে গোবরে অবস্থা। যে ব্রিটেন ছিল এমন এক সাম্রাজ্যের অধিকারী যেখানে সূর্য্যাস্ত হত না , যে ব্রিটেন আজ বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহৎ অর্থনীতি এবং পাঁচ পরাশক্তির একটি , তথাকথিত আধুনিক (?) জ্ঞান - বিজ্ঞান , শিল্প ও প্রযুক্তি তথা নব্য পশ্চিমা বস্তুবাদ , ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের আদলে ধর্মহীনতা ও লিবারেল (উদার তবে অনুদার বলাই শ্রয়) ডেমোক্রেসির (!) সূতিকাগার সেই মহাশক্তিধর ব্রিটেনের কেন শনির দশা? যে ব্রিটেন দুশো বছরের সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও শোষণ চালিয়ে ভারত থেকে ৪৬ ট্রিলিয়ন ডলার পরিমাণ টাকা লুট পাট করে নিয়ে নিজেদের শিল্প ও প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটিয়েছে যে ব্রিটেন শুধু ভারত বর্ষ নয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও অঞ্চলকে সাম্রাজ্যবাদী শাসনাধীন করে ঐ সকল দেশের সকল সম্পদ ও অর্থ লুট করেছে তার কেন এহেন দৈন্য দশা?! গার্ডিয়ানের এ রিপোর্ট থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে ব্রিটেনের সার্বিক অবস্থা ৪২ বছর ধরে অত্যন্ত কঠোর ইঙ্গো - মার্কিন সার্বিক অবরোধের শিকার ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের চেয়েও সংগীন ও করুণ!! এর কারণ কী?

ব্রিটেন তো ইরানের মতো সার্বিক কঠোর অবরোধের শিকার নয়। ইরানের মতো বৈরী শত্রু ও পরাশক্তি সমূহের ষড়যন্ত্রেরও শিকার নয়? তারপরও কেন ব্রিটেনের কোমর ভাঙ্গা অবস্থা? এ অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে যে উপর দিয়ে ফিটফাট ভিতর দিয়ে সদর ঘাটের প্রকৃষ্ট নমুনা ও উদাহরণ হচ্ছে ব্রিটেন। তবে ব্রিটেনের মতো অপরাপর পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থা। যারা নিজেদের জনগণের এক বিরাট অংশের খাবার ও নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের প্রয়োজন মেটাতে পারে না তারা কিভাবে বিশ্ববাসীর সমস্যা সমাধান করবে? তাদের কাছে সমস্যা সমাধান ও সাহায্য চাওয়া অরণ্যে রোদন ছাড়া আর কিছু নয় কি ?! বরং বিশ্বের দুরাবস্থার জন্য প্রধানত: দায়ী ব্রিটেন , ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ অধিকাংশ পশ্চিমা দেশগুলো এবং তার পরবর্তী পর্যায়ে রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশস্থ পশ্চিমা দেশগুলোর বশংবদ ধামাধরা তল্পীবাহক দেশীয় দালাল ও অনুচরেরা। এদের আবহ ও প্রভাব বলয় থেকে যদি বিভিন্ন দেশ বের হয়ে আসে তাহলে বিশ্বের সার্বিক মঙ্গল ও কল্যাণ সাধিত হবে।

তবে ব্রেক্সিট করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রাক্তন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নব জীবন দান ও নতুন অবয়বে তা উপস্থাপন করা। আর অকুস (AUKUS ) চুক্তি হচ্ছে সেই অশুভ শয়তানী সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ বা পর্যায় স্বরূপ। এর দ্বিতীয় ও পরবর্তী ধাপগুলোয় (যদি এই সর্বনাশা লক্ষ্য ও পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় তাহলে) বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সকল এনার্জি উৎস (তেল - গ্যাস খনি সমূহ) এবং খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ দখল ও কব্জা করা। আর ব্রিটেনের সাম্প্রতিক জ্বালানি তেল সংকট যদিও তা আপাতত: ট্রাক ও পরিবহন যানবাহনের চালকদের স্বল্পতা ও ঘাটতির জন্য হয়েছে বলা হলেও পরিশোধিত জ্বালানী তেল ও গ্যাসের স্বল্পতা থেকে যে উদ্ভূত তাতে কোনো সন্দেহ নেই যদিও ব্রিটেন তা স্বীকার করে নি এবং বলছে যে ব্রিটেনের নাকি পর্যাপ্ত পরিমাণে পরিশোধিত জ্বালানী  আছে । তবে ইদানিং বা সম্প্রতি গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল বাড়ানো থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে ব্রিটেনের জ্বালানি তেল ও গ্যাসের ঘাটতি সমস্যা আছে । তাই বিশ্বের তেল ও গ্যাসের খনি ও উৎস্য সমূহ দখল ও কব্জা করা এখন ব্রিটেন , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , কানাডা , অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড  - এই পাঁচ অ্যাঙ্গলো ফোনিয়ান দেশ একত্রে একযোগে ব্রিটিশ কমন ওয়েলথ ভুক্ত দেশগুলোকে (  সম্ভব হলে এ জোটের সবকটি দেশ অথবা অন্তত গুরুত্বপূর্ণ দেশ গুলো  ) সাথে নিয়ে অকুসকে সম্প্রসারিত করে এ জোটের চেয়েও বড় জোট গঠন করার প্রয়াস চালাবে নি: সন্দেহে । আর ইঙ্গো - মার্কিন ইঙ্গিতেই ইসরাইল - তুরস্ক - আযারবাইজান যে আঁতাত গঠিত হয়েছে তার উদ্দেশ্য হচ্ছে ককেশাস - কাস্পিয়ান - তুর্কমেনিস্তান অঞ্চলের বিশাল তেল - গ্যাস খনি ও উৎস্য সমূহের উপর ইঙ্গো - মার্কিন - ইসরাইলী - তুর্কী অশুভ শয়তানী সাম্রাজ্যবাদী জোটের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যা হবে অকুসের সম্প্রসারণ অথবা অকুসের মতো আরেক চুক্তি যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে ইরানকে তার উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তে ব্যতিব্যস্ত রাখা।

ইসলামী চিন্তাবিদ এবং গবেষক হুজ্জাতুল ইসলাম ওলায় মুসলেমিন মুহাম্মদ মুনীর হুসাইন খান

নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য:
* captcha: