IQNA

ইসলামের অনন্য মহামানব ইমাম রেজা (আ.)

12:45 - June 11, 2022
সংবাদ: 3471972
তেহরান (ইকনা): ১১ জিলকাদ ইসলামের ইতিহাসের অত্যন্ত স্মরণীয়-বরণীয় মহাআনন্দের দিন। ১৪৮ হিজরির এই দিনে মদিনায় ইমাম মুসা ইবনে জাফর সাদিক (আ.)'র ঘর আলোকিত করে ভূমিষ্ট হন মহানবীর (সা) আহলে বাইতের অন্যতম সদস্য ইমাম রেজা (আ.)।
ইসলামের অনন্য মহামানব ইমাম রেজা (আ.)
১১ জিলকাদ ইসলামের ইতিহাসের অত্যন্ত স্মরণীয়-বরণীয় মহাআনন্দের দিন। ১৪৮ হিজরির এই দিনে মদিনায় ইমাম মুসা ইবনে জাফর সাদিক (আ.)'র ঘর আলোকিত করে ভূমিষ্ট হন মহানবীর (সা) আহলে বাইতের অন্যতম সদস্য ইমাম রেজা (আ.)। পার্সটুডে
 
বলেছিলেন রাহমাতুললিল আলামিন তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীতে
'আমার শরীরের একটি টুকরা হবে দাফন খোরাসানের মাটিতে'!
খুলে দেখ আজও পাবে এ হাদিস আল্লামা জামীর বই শাওয়াহেদুন্নবুওয়্যাতে-
যে করবে তাঁর পবিত্র সেই বংশধরের পাক রওজা জিয়ারত 
হবে সে বেহেশতবাসী- হাদিসের এ বাণীও আসমানি সত্য আলবৎ! 
ইসলামের ১২ নক্ষত্রের অষ্টম তিনি ধরণীতে খোদায়ি রহমত!
মহানবীর মহতী প্রতিনিধি তিনি জীবনের পরতে পরতে
 প্রাণবন্ত ও জীবন্ত হয়েছিল যেথায় মহানবীর সুন্নত!
ইরান হয়েছে ধন্য পেয়ে এই অমূল্য নববী-রত্ন-মহৎ!
অভিশপ্ত সে যে পেয়েও জ্ঞান ও গুণে অনন্য এ ইমামের সোহবত
গোপনে বিষ পান করিয়ে তাঁরে বাঁচাতে চেয়েছে অবৈধ খেলাফত!  
চিনেছিল তাঁকে বনের হরিণী হয়েছিলেন তিনি তার জিম্মাদার
শিকারির হাতে পড়ে ধরা চেয়েছিল সে শাবকে দিতে স্তন্য আরও একটিবার!
ইমামের জিম্মায় দিয়ে স্তন্য সেই ক্ষুধার্ত শাবকে ফিরে আসে সেই হরিণী আবার!...
হে নবীজীর দ্বীনের কর্ণধার!/দুনিয়ায় চাই হতে ধন্য পেয়ে তোমার মাজারের স্পর্শ বারবার!
যেন বিচারদিবসেও পাই তব শাফায়াত/তোমার আদর্শ হোক মোদের আবে-হায়াত
তব সংগ্রামের পথ ও মহান শাহাদাত /আজও দেখায় রাজপথ হেরার আলোকের 
প্রমাণ তুমি আজও নুর-নবীর নবুওয়্যতের!/ তব মাশহাদ যেন কাবার প্রতিচ্ছবি এশকে বেলায়াতের!
 
 
১৮৩ হিজরিতে খলিফা হারুনের কারাগারে পিতা ইমাম কাজিম (আ.)'র শাহাদতের পর পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে মুসলিম উম্মাহর ইমামতের ঐশী দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইমাম রেজা (আ.)। এ মহান ইমামের জন্মদিন উপলক্ষে এই ইমাম ও বিশ্বনবী (সা) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের শানে পাঠাচ্ছি অশেষ দরুদ আর সালাম ও সবাইকে জানাচ্ছি প্রাণঢালা মুবারকবাদ।
মহানবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের ধারার মাসুম বা নিষ্পাপ ইমামরা ছিলেন মানব জাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। অসাধারণ নানা গুণ ও যোগ্যতার জন্য আলী ইবনে মুসা রেজা (আ.) রেজা বা সন্তুষ্ট, সাদিক বা সত্যবাদী, ফাজেল বা গুণধর, মু'মিনদের চোখের প্রশান্তি বা আলো ও কাফিরদের ক্ষোভের উৎস প্রভৃতি উপাধি পেয়েছিলেন। 'আলেমে আ'লে মুহাম্মদ' বা মুহাম্মদ (সা.)'র আহলে বাইতের আলেম ছিল ইমাম রেজার (আ.) অন্যতম বড় উপাধি হল ।
ইমাম রেজার (আ.)  ইমামতির বিশ বছর ছিল আব্বাসীয় বাদশাহ হারুন এবং তার দুই পুত্র আমিন ও মামুনের শাসনকাল। ইমাম তাঁর পিতা ইমাম মূসা কাজিমের ( আ. ) নীতি-আদর্শকে অব্যাহত রাখায় বাবার মত তিনিও রাজগোষ্ঠীর রোষের মুখে পড়েন। আব্বাসীয় বাদশা হারূন ও মামুন ইমামদের প্রেমিক হওয়ার ভান করলেও ভেতরে ভেতরে ছিল তাঁদের মহাশত্রু। অব্বাসিয়রা ইমামদের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তির কথা বলে একদিকে আহলে বাইত ও নবীবংশ প্রেমিকদের সংগ্রাম ঠেকানোর ও অন্যদিকে এই ধারার তথা শিয়া মুসলমানদের মন জয়ের চেষ্টা করত। কিন্তু ইমাম রেজা (আ.) এই কূট-কৌশল বানচাল করেন।
ইসলামী খেলাফত কেবল নবী পরিবারের  পবিত্র ইমামগণের ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং তাঁরা ছাড়া কেউ ঐ পদের যোগ্য নয়- জনগণ যাতে এই খোদয়ি বিধান ভুলে থাকে সে লক্ষ্যে ধূর্ত মামুন ইমাম রেজাকে (আ) সবসময়ই জন-বিচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করে। প্রায় সকল ইমামকেই এভাবে গণ-বিচ্ছিন্ন রাখতে চেয়েছে উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসকরা গৃহবন্দী করে ও কঠোর প্রহরায় রেখে। কিন্তু তারপরও নিষ্পাপ ইমামদের বার্তা জনগণের কাছে ঠিকই পৌঁছে যেত নানা কৌশলে। 
জনগণ নবীবংশের মহান ইমামদের বার্তা পেয়ে তাঁদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করত । ইমাম রেজা (আ.) যখন বাদশাহ মামুনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেলেন, তখন অধিকাংশ ইরাকী মামুনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হন। হযরত আলী(আ.)’র  পবিত্র খান্দানের কেউ বাদশাহর বিরুদ্ধে গেলে বাদশাহি যে হারাতে হবে-মামুন তা বুঝত। ফলে বাদশাহ মামুন ইমামকে খোরাসানে আসার আমন্ত্রণ জানায়। ইমাম প্রথমত রাজি হন নি, কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁকে বাধ্য করা হয়। বাধ্য হয়ে ইমাম রেজা বসরা হয়ে ইরানে আসেন। তিনি যেখানেই গেছেন জনগণ তাঁকে সাদরে গ্রহণ করে। ইমামও মহানবীর আহলে বাইত ও নিষ্পাপ ইমামদের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য এবং ইসলামের সঠিক বিধি-বিধান জনগণের কাছে তুলে ধরেন। সেইসাথে বাদশাহর আমন্ত্রণের কথাও তাদেরকে জানান। 
 
 
ধূর্ত মামুন ইমামের হাতে খেলাফত ন্যস্ত করার প্রস্তাব দেয়। ইমাম, মামুনের এই কূটচালের জবাবে বলেছিলেন, মহান আল্লাহ যদি খিলাফত তোমাকে দান করে থাকেন তাহলে তা অন্যকে দেয়া উচিত হবে না। আর যদি তুমি আল্লাহর পক্ষ থেকে খেলাফতের অধিকারী না হও, তাহলে সে দায়িত্ব কারো উপর ন্যস্ত করার অধিকারও তোমার নেই। ইমাম খেলাফতের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করায় মামুন ইমামকে তার ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী হতে বাধ্য করে। ইমাম রেজা (আ.) শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে দূরে থেকে খেলাফতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন না করার শর্তসাপেক্ষে যুবরাজের পদ গ্রহণ করেন। 
ইমাম রেজা'র এই দায়িত্ব গ্রহণে আব্বাসীয়রা ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। বাদশা মামুন তার আসল উদ্দেশ্যের কথা তাদেরকে খুলে বলে। আসলে ইমামকে খোরাসানে আমন্ত্রণ জানানোসহ মামুনের পরবর্তী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য ছিল, শিয়াদের বৈপ্লবিক সংগ্রামকে  স্তব্ধ করা ও আব্বাসীয় খেলাফতকে বৈধ বলে প্রমাণ করা। 
মামুন ও তার দলবল ইমামকে নানাভাবে হেয় করতে চেয়েও খোদায়ি জ্ঞান ও প্রজ্ঞা-সমৃদ্ধ ইমামকে তারা কিছুতেই অপদস্থ করতে পারে নি। যেমন, বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের দিয়ে জটিল প্রশ্ন করে ইমাম রেজা (আ.)-কে জব্দ করার চেষ্টা করে তারা। ক্ষরা-পীড়িত অঞ্চলে বৃষ্টির জন্য ইমামকে দিয়ে তারা এই আশায় দোয়া করায়  যে দোয়া কবুল না হলে ইমামের মর্যাদা ধূলিসাৎ হবে। কিন্তু ইমাম প্রতিটি জ্ঞানগত বিতর্কে বিজয়ী হতেন এবং বৃষ্টির জন্য করা তাঁর দোয়াও কবুল হয়েছিল। ফলে ইমাম রেজার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে ও মামুনের হিংসা ও ক্রোধও বাড়তে থাকে। ইমাম মামুনের বিরুদ্ধে অকপট সত্য বলতেন নির্ভয়ে। কোনোভাবেই ইমামকে জব্দ করতে না পেরে মামুন ইমামকে বিষ পানে বাধ্য করে।  ২০৩ হিজরির ১৭ সফর পঞ্চান্ন বছর বয়সে ইমাম রেজা-আ শাহাদাত বরণ করে অমর হন। ইমাম রেজা (আ.) বলেছিলেন, যে মানুষের মাঝে সবচেয়ে প্রিয় হতে চায় সে যেন আল্লাহ সম্পর্কে সতর্ক বা মুত্তাকী হয় গোপনে ও প্রকাশ্যে।
নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য:
* :