IQNA

কারবালা কাহিনি: চাচা-ভাতিজার অনন্য ভালোবাসা

21:21 - August 12, 2022
সংবাদ: 3472276
তেহরান (ইকনা): পবিত্র মহররম মাস হিজরী সনের প্রথম মাস। এ মাসের ১০ তারিখে অর্থাৎ ৬১ হিজরীর পবিত্র আশুরার দিন ইরাকের কারবালার ময়দানে সংঘটিত হয়েছিল এক অসম যুদ্ধ।
ঐতিহাসিক এ যুদ্ধে রাসূল (সা.)-এর নাতি ইমাম হুসেইন (আ.) অবৈধ উমাইয়া শাসক ইয়াজিদের বিশাল বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে শহীদ হন। সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে, এ যুদ্ধে মাত্র ১৩ বছর বয়সী কিশোর কাসিম এবং দুধের শিশু আলী আসগরও শহীদ হন। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন- (ইকো)
 
কুল মাখলুক কাঁদিয়ে ওই এলো মহররম
 
হায় হোসেন! হায় হোসেন! উঠলো রে মাতম
 
সারা জাহান কেঁদে বিভোর আসমান-জমিন
 
দজলা কাঁদে ফোরাত কাঁদে কাঁদে মুসলিমিন....
 
কাতরা পানি পায়নি  হায়রে পিয়াসে কাতর
 
তির খেয়ে যে মরলো কচি শিশু সে আসগর।
 
বন্ধুরা, বেদনাবিধুর মহররম উপলক্ষে আমরা একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। এতে আমরা ইমাম হুসেইন (আ.) এবং তার ভাতিজা অর্থাৎ হযরত ইমাম হাসানের (আ.)-এর পুত্র হযরত কাসেমের অনন্য ভালোবাসার এক কাহিনি তুলে ধরব। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনায় রয়েছি আমি গাজী আব্দুর রশীদ এবং সহকর্মী আক্তার জাহান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।
 
বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, ১০ মহররম ভোর বেলায় ইয়াজিদের হাজার হাজার সৈন্যের বিশাল বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে যায় ঈমানের বলে বলীয়ান এক ক্ষুদ্রবাহিনী। এ দৃশ্যটি বর্ণনা করেছেন বাংলাদেশের কবি আসাদ বিন হাফিজ তাঁর 'কারবালা কাহিনী' কবিতায়। কবিতাটি আবৃত্তি করে শুনিয়েছে বাংলাদেশি বন্ধু তৌহিদুল ইসলাম তারেক।
 
কম বেশী সকলের জানা কাহিনী
মুখোমুখি দুই দল সেনাবাহিনী৷
একদল সত্যের পতাকাবাহী
আরেক দল দুনিয়ায় চায় বাদশাহী৷
 
সত্যের দলনেতা ইমাম হোসেন
বাদশাহী আশা বুকে এজিদ পোষেণ৷
নবীজির নাতি তিনি, পুত্র আলীর
ফাতেমার নয়নের মনি মহাবীর৷
 
ইমাম হোসেন নাম, হাসানের ভাই
তাঁর সাথে এজিদের বাঁধলো লড়াই৷
মুক্ত কৃপাণ হাতে দুই দল খাড়া
চারদিকে বেজে উঠে কাড়া নাকাড়া৷
 
শন শন তীর ছোটে এদিক-ওদিক
ঘোড়ার খুরের আওয়াজ বাজে চারদিক৷
ফোরাত নদীর কুল কারবালা মাঠ
মানুষের লাশ দিয়ে হ'ল তা ভরাট৷
 
এজিদের তাঁবু জুড়ে বাসা বাঁধে ভয়
অবশেষে থামে এই যুদ্ধ প্রলয়৷
লড়াই থামলে ইমাম তাকিয়ে দেখেন
সাথী হারা তিনি যেন একাকী আছেন৷
 
মনের দুঃখে ইমাম হয়ে অসহায়
নিজেকে লুটিয়ে দেন মরু বালুকায়৷
তখন সেখানে এক পাষন্ড সীমার
এসে নিজ হাতে কাটে ইমামের ঘাড়৷
 
ছিন্ন মস্তক গেঁথে বর্শার আগায়
নরপশু ছুটে চলে এজিদ সভায়৷
কম বেশী সকলের এই জানা কাহিনী
স্মরণে আস্লে ফেলে দু'চোখের পানি৷
 
হাজার বছর আগে মহররম মাসে
ঘটেছিল আজও তবু হৃদয়ে তা ভাসে৷
 
 
বন্ধুরা, ঐতিহাসিক কারবালার ময়দানে হৃদয়বিদারক বহু ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে আমরা ইমাম হুসেইন (আ.) ও তাঁর কিশোর ভাতিজা হযরত কাসিমের ভালোবাসার কাহিনিটি তোমাদেরকে শোনাব।
 
ইমাম হুসাইন (আ) তাঁর জীবনের শেষ রাতে যখন সঙ্গীদের জানালেন, জালিম ও বলদর্পী খোদাদ্রোহী শত্রুরা শুধু তাঁকেই চায় হত্যা করতে। তাঁর কাছ থেকে জোর করে ইয়াজিদের জন্য আনুগত্য আদায় অথবা তাঁকে হত্যা করাই তাঁদের মূল টার্গেট। তাই অন্যরা চাইলে সবাই তাঁকে ত্যাগ করতে পারেন জীবন বাঁচানোর জন্য।
 
তাঁর একদল ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও সঙ্গী যাদের সংখ্যা ১০০’রও কিছু কম বা সামান্য বেশি ছিল- তাঁদের সবাই যখন সকলেই এক জায়গায় ও এক বাক্যে সুস্পষ্ট ভাষায় তাঁদের নিষ্ঠা ও আনুগত্যের ঘোষণা দিলেন এবং বললেন যে, আমরা কখনো আপনাকে ছেড়ে চলে যাবো না, তখন সহসাই পট পরিবর্তন হয়ে গেল।
 
ইমাম বললেন, তোমরা সকলেই জেনে রাখো যে, আমরা শহীদ হতে যাচ্ছি। তখন সকলে বলল, আলহামদুলিল্লাহ- আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করছি যে, তিনি আমাদেরকে এ ধরনের তাওফিক দান করেছেন। এটা আমাদের জন্য এক সুসংবাদ, একটি আনন্দের ব্যাপার।
 
এসময় মজলিসের এক কোণে একজন কিশোর বসেছিলেন; বয়স বড় জোর তেরো বছর হবে। ইমাম হুসাইনের দিকে ফিরে তিনি বললেন:  চাচাজান! আমিও কি নিহতদের অন্তর্ভুক্ত হবো? এ কিশোর ছিলেন হযরত ইমাম হাসান (আ)-এর পুত্র হযরত কাসেম।
 
এ সময় হযরত ইমাম হুসাইন (আ) স্নেহশীলতার পরিচয় দেন। তিনি প্রথমে জবাব দানে বিরত থাকলেন। এরপর কিশোরকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাতিজা! প্রথমে তুমি আমার প্রশ্নের জবাব দাও, এরপর আমি তোমার প্রশ্নের জবাব দেবো। তুমি বলো, তোমার কাছে মৃত্যু কেমন; মৃত্যুর স্বাদ কী রকম?
 
কিশোর জবাব দিলেন, আমার কাছে মধুর চেয়েও অধিকতর সুমিষ্ট। আপনি যদি বলেন যে, আমি আগামীকাল শহীদ হবো তাহলে আপনি আমাকে সেই সুসংবাদই দিলেন। তখন ইমাম হুসাইন জবাব দিলেন, হ্যাঁ, ভাতিজা! কিন্তু তুমি অত্যন্ত কঠিন কষ্ট ভোগ করার পর শহীদ হবে। কাসেম বললেন: আল্লাহর শুকরিয়া, আল-হামদুলিল্লাহ- আল্লাহর প্রশংসা যে, এ ধরনের ঘটনা ঘটবে।
 
এ ঘটনার পরদিন কারবালার যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে ইমাম হুসাইনের পুত্র  হযরত আলী আকবর শহীদ হন। এর পর তেরো বছরের কিশোর কাসেম ইমাম হুসাইনের নিকট এগিয়ে এলেন। যেহেতু তিনি ছিলেন নাবালেগ কিশোর, তার শরীরের বৃদ্ধি তখনো সম্পূর্ণ হয় নি, তাই তার শরীরে অস্ত্র ঠিকভাবে খাপ খাচ্ছিলো না; কোমরে ঝুলানো তলোয়ার ভূমি স্পর্শ করে কাত হয়েছিল। আর বর্মও ছিল বেশ বড়, কারণ বর্ম পূর্ণবয়স্ক পুরুষদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল, কিশোরদের জন্য নয়। টুপি বড়দের মাথার উপযোগী, ছোট বাচ্চাদের উপযোগী নয়। কাসেম বললেন, চাচাজান! এবার আমার পালা। অনুমতি দিন আমি রণাঙ্গনে যাই।
 
ইমাম হুসাইন সাথে সাথেই কাসেমকে অনুমতি দিলেন না। তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। কাসেম ও তাঁর চাচা পরস্পরকে বুকে চেপে ধরে কাঁদতে লাগলেন। হযরত কাসেম তার চাচা ইমাম হুসাইনের হাত ও পা চুম্বন করতে শুরু করলেন। তাকে যতক্ষণ না অনুমতি দেয়া হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি ইমাম হুসেইনের হাত ও পা চুম্বন অব্যাহত রাখেন।
 
কাসেম অনুমতির জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকলেও ইমাম হুসাইন (আ.) অনুমতি দানে বিরত থাকলেন। ইমাম মনে মনে চাচ্ছিলেন কাসেমকে অনুমতি দেবন এবং বলবেন, যদি যেতে চাও তো যাও। কিন্তু মুখে সাথে সাথেই অনুমতি দিলেন না। বরং সহসাই তিনি তার বাহুদ্বয় প্রসারিত করে দিলেন এবং বললেন, এসো ভাতিজা! এসো, তোমার সাথে খোদা হাফেযী করি। 
 
কাসেম ইমাম হুসাইনের কাঁধের ওপর তাঁর হাত দুটো রাখলেন এবং ইমামও কাসেমের কাঁধের ওপর হাত দুটি রাখলেন। এরপর উভয়ে কাঁদলেন। ইমামের সঙ্গী সাথীরা ও তাঁর আহলে বাইতের সদস্যরা এ হৃদয় বিদারক বিদায়ের দৃশ্য দেখলেন। এসময় উভয়ে এতই ক্রন্দন করলেন যে, উভয়ই অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। এরপর এক সময় তারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হলেন এবং কিশোর কাসেম সহসাই তাঁর ঘোড়ায় আরোহণ করলেন।
 
ইয়াজিদি বাহিনীর মধ্যে অবস্থানকারী বর্ণনাকারী বলেছেন, সহসাই আমরা একটি বালককে দেখলাম ঘোড়ায় চড়ে আমাদের দিকে আসছে যে তার মাথায় ধাতব-টুপির পরিবর্তে একটি পাগড়ী বেধেছে। আর তার পায়ে যোদ্ধার বুট জুতার পরিবর্তে সাধারণ জুতা এবং তার এক পায়ের জুতার ফিতা খোলা ছিল; আমার স্মৃতি থেকে এটা মুছে যাবে না যে, এটা ছিলো তার বাম পা। তারপর বর্ণনাকারী বলেন: সে যেন চাঁদের একটি টুকরা। কাসেম যখন আসছিল তখনো তার গণ্ড দেশে অশ্রুর ফোটা দেখা যাচ্ছিল।
 
সবাই অনুপম সুন্দর এ কিশোর যোদ্ধাকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল এবং ভেবে পাচ্ছিল না যে, এ ছেলেটি কে! তৎকালে রীতি ছিল এই যে, কোনো যোদ্ধা রণাঙ্গনে আসার পর প্রথমেই নিজের পরিচয় দিতো যে, আমি অমুক ব্যক্তি। উক্ত রীতি অনুযায়ী কাসেম প্রতিপক্ষের সামনে এসে পৌঁছার পর উচ্চস্বরে বললেন: 
 
"যদি না চেনো আমাকে জেনো আমি হাসান তনয়- 
 
সেই নবী মুস্তাফার নাতি যার ওপর ঈমান আনা হয়
 
ঋণে আবদ্ধ বন্দী সম এই যে হুসাইন প্রিয়জনদের মাঝে,
 
পানি দেয়া হয়নি যাদের উত্তম রীতি মেনে।’’
 
কাসেম রণাঙ্গনে চলে গেলেন, আর হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) তার ঘোড়াকে প্রস্তুত করলেন এবং ঘোড়ার লাগাম হাতে নিলেন। মনে হচ্ছিলো যে তিনি তার দায়িত্ব পালনের জন্য যথা সময়ের অপেক্ষা করছিলেন। জানি না তখন হযরত ইমামের মনের অবস্থা কেমন ছিল। তিনি অপেক্ষমান; তিনি কাসেমের কণ্ঠ শোনার জন্য অপেক্ষমাণ। সহসাই কাশেমের কণ্ঠে ‘‘চাচাজান!’’ ধ্বনি উচ্চকিত হলো।
 
বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বুঝতে পারলাম না ইমাম হুসাইন কত দ্রুত গতিতে ঘোড়ায় আরোহণ করলেন এবং রণাঙ্গনের দিকে ছুটে এলেন। তার এ কথা বলার তাৎপর্য এই যে, ইমাম হুসাইন এক শিকারি বাজ পাখির মত রণাঙ্গনে পৌঁছে যান।
 
কাসেম যখন ঘোড়ার পিঠ থেকে মাটিতে পড়ে যান তখন শত্রুপক্ষের প্রায় দুইশ' যোদ্ধা তাঁকে ঘিরে ফেলে। তাদের একজন কাশেমের মাথা কেটে ফেলতে চাচ্ছিল। কিন্তু তারা যখন দেখল যে, ইমাম হুসাইন তীব্র গতিতে ঘোড়া চালিয়ে এগিয়ে আসছেন তখন তাদের সকলেই সেখান থেকে পালিয়ে গেল। আর যে ব্যক্তি কাসেমের মাথা কাটতে চাচ্ছিলো সে তাদেরই ঘোড়ার পায়ের নীচে পিষ্ট হলো। যেহেতু তারা খুবই ভয় পেয়ে গিয়েছিল সেহেতু তারা তাদের বন্ধুর ওপর দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে পালিয়ে যায়। অনেক লোক একবারে ঘোড়া চালিয়ে পালিয়ে যাচ্ছিলো; কেউ কারো দিকে তাকাবার অবকাশ পাচ্ছিলো না। মহা কবি ফেরদৌসীর ভাষায়:
 
‘‘সেই বিশাল প্রান্তরে কঠিন ক্ষুরের ঘায়ে ধরণী যেন হলো ছয় ভাগ আর আসমান আট।’’ কেউ বুঝতে পারল না যে, কী ঘটে গেলো। ঘোড়ার ক্ষুরের আঘাতে সৃষ্ট ধুলার কুণ্ডলী যখন বসে গেল এবং হাওয়া কিছুটা স্বচ্ছ হলো তখন সবাই দেখতে পেল যে, ইমাম হুসাইন (আ.) কাসেমকে কোলে নিয়ে আছেন। আর কাসেম তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো অতিক্রম করছিলেন এবং যন্ত্রণার তীব্রতার কারণে মাটিতে পা আছড়াচ্ছিলেন। এ সময় শোনা গেল, ইমাম হুসাইন (আ.) বলছেন: ‘‘আল্লাহর শপথ, এটা তোমার চাচার জন্য কতই না কষ্টকর যে, তুমি তাকে ডাকলে কিন্তু তার জবাব তোমার কোনো কাজে এলো না।’’
 
বন্ধুরা, জালিম ইয়াজিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে ইমাম হুসাইন (আ.), তাঁর পরিবার ও সঙ্গীরা আমাদেরকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন যে, কোন শাসক ইসলামের নীতিমালা থেকে দূরে সরে গেলে কিংবা অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখল করলে তার বিরুদ্ধে নিজের সাধ্যনুযায়ী সংগ্রাম করতে হবে। ইমাম হুসাইন তাঁর নিজের, পরিবার পরিজনের এবং সঙ্গী সাথীদের জীবন উৎসর্গ করে ইসলামকে যেভাবে রক্ষা করে গেছেন, বিশ্বের সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে সে দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে হবে। তাহলে ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর সঙ্গী সাথীদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।  পার্সটুডে
নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য:
captcha