
ইমাম হাদী (আ.)-এর ইমামতের যুগ আব্বাসীয় শাসনের দুটি ভিন্ন পর্যায়ের মধ্যবর্তী স্থানান্তরকাল ছিল। পূর্ববর্তী খলিফাদের সময়ে শাসনযন্ত্র যে মহিমা ও প্রতাপ ধারণ করেছিল, তা হারিয়ে ফেলেছিল এবং ক্ষমতা যেন হাতে হাতে ঘুরতে শুরু করেছিল। এ যুগের খলিফাদের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে কিছু অ-আরব জাতির গভর্নররা স্বাধীনভাবে শাসন চালাতে শুরু করেন। মুতাসিমের শাসনকালে তুর্কিস্তানী তুর্কীদের প্রভাব বৃদ্ধির সঙ্গে এ ঘটনা আরও তীব্র হয়। তুর্কীদের অত্যধিক ক্ষমতা এবং ক্ষমতা দখলের জন্য তাদের যুদ্ধপ্রিয় ও রক্তপিপাসু মনোভাব আব্বাসীয়দের দুর্বল করে দিয়েছিল। তুর্কীদের ক্ষমতায়ন, সামাররা দখল এবং আরবদের শাসন থেকে বঞ্চিত করা আরবদের ক্ষোভের কারণ হয় এবং তুর্কীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিদ্রোহের জন্ম দেয়।
অন্যদিকে, শিয়াদের বিশ্বাস যে নবী পরিবারের খিলাফতই সঠিক, আলভীদের অত্যাচারের কাছে আত্মসমর্পণ না করার মনোভাব, আব্বাসীয়দের অত্যধিক চাপ ও শিয়াদের গণহত্যা—এসব কারণে আলভীদের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা নিজেদের ইমামদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং শাসকগোষ্ঠীর নিন্দনীয় কর্মকাণ্ডের অবসানের জন্য বিদ্রোহে নামেন, যার ফলে আলভী আন্দোলনের উদ্ভব ও বিস্তার ঘটে।
ইকনার কোম প্রতিনিধি ইমাম হাদী (আ.)-এর শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে হাওযা ইলমিয়া কোমের শুবহাত প্রত্যুত্তর ও গবেষণা কেন্দ্রের রাজনীতি ও সমাজ বিভাগের সচিব আলী মুজতাবাযাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় এই মহান ইমামের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত নিম্নে পড়ুন:
ইকনা: ইমাম হাদী (আ.) কীভাবে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন? ইমাম হাদী (আ.) ২২০ হিজরীতে পিতার শাহাদাতের পর মাত্র আট বছর বয়সে ইমামত লাভ করেন। তাঁর ইমামতের মেয়াদ ছিল ৩৩ বছর এবং জীবনকাল ৪১ বছরের কিছু বেশি। ২৫৪ হিজরীতে সামাররায় তাঁকে শহীদ করা হয়। তাঁর রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম বোঝার জন্য তাঁর যুগের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতির দিকে তাকাতে হবে।
এ যুগে মুতাসিমের সময় থেকে আব্বাসীয় দরবারে তুর্কীদের প্রভাব এতটাই বেড়ে যায় যে তারা নিজেদের ইচ্ছা আব্বাসীয় শাসনে চাপিয়ে দিতে শুরু করে এবং ইসলামী দেশের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে। আব্বাসীয় শাসকরা এ যুগে তুর্কীদের হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হয়। ইমাম হাদী (আ.)-এর ৩৩ বছরের ইমামতকালে ছয়জন খলিফা ক্ষমতায় আসীন হন।
এ যুগের আব্বাসীয় শাসকদের বৈশিষ্ট্য ছিল বিলাসিতা, মদ্যপান ও গায়ক-গায়িকাদের সান্নিধ্য। জালালুদ্দিন সুয়ুতি এ প্রসঙ্গে লিখেছেন: “মুতাওয়াক্কিল ভোগ-বিলাস ও মদ্যপানে ডুবে ছিলেন; তাঁর অন্তঃপুরে চার হাজার দাসী ছিল।” (সুয়ুতি, তারিখুল খুলাফা, পৃ. ৩৪৯-৩৫০)
আব্বাসীয় খলিফাদের অত্যাচার ও দুর্নীতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আলভী আন্দোলনের প্রসার ঘটে। কেবল ২১৯ থেকে ২৭০ হিজরীর মধ্যে ঐতিহাসিক গ্রন্থে ১৮টি বিদ্রোহের উল্লেখ পাওয়া যায়, যদিও সবগুলোই শেষ পর্যন্ত দমন করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শাসকগোষ্ঠী ইমামকে (যিনি শাসনের বিরুদ্ধে প্রধান হুমকি ছিলেন) কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং সামরায় (যা একটি সামরিক ঘাঁটি ছিল) তাঁকে নজরবন্দি করে।
ইকনা: ইমাম হাদী (আ.)-এর যুগে বিভিন্ন মতবাদের উদ্ভব কীভাবে ঘটেছিল? ইমাম হাদী (আ.)-এর যুগের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বিভিন্ন মতাদর্শিক ধারার উদ্ভব, যার ভিত্তি আব্বাসীয় শাসনের তৈরি করা চিন্তার স্বাধীনতার নামে পরিবেশে গড়ে উঠেছিল। গুলাত, সুফি ও ওয়াকিফিয়া এগুলোর মধ্যে প্রধান। এ যুগের আব্বাসীয় খলিফাদের আচরণ থেকে বোঝা যায়, তারা যে কোনো উপায়ে শিয়াদের নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল।
ইমাম ও শিয়াদের উপর কঠোরতা, শিয়াদের বিরুদ্ধে মিথ্যা গুজব ছড়ানো, ইমামকে নজরবন্দি রাখা এবং জনগণের সঙ্গে যোগাযোগে বাধা দেওয়া—এগুলো ছিল তাদের কিছু পদক্ষেপ। কিন্তু এমন পরিবেশ ও চাপ সত্ত্বেও ইমাম হাদী (আ.) হিদায়াতের ভূমিকা, চিন্তাগত ও রাজনৈতিক বিপথগামিতার মোকাবিলা, শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেকে পিছপা হননি এবং সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জালিম শাসনের বিরোধিতা, দ্বীনের মৌলিক বিষয় ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক-চিন্তাগত বিপথগামিতার মোকাবিলা অব্যাহত রাখেন।
ইকনা: ইমাম হাদী (আ.)-এর রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগুলো কী ছিল?
১. ইমামতের মর্যাদা ব্যাখ্যা ও সুপ্রতিষ্ঠা: ইমাম হাদী (আ.) সব বাধা সত্ত্বেও ইমামতের সার্বিক কৌশল বাস্তবায়নে চেষ্টা করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, এক মজলিসে মুতাওয়াক্কিল ইমামের কাছে জোর করে কবিতা পড়িয়ে মজলিসকে কাঁদিয়ে দেন, তারপর জিজ্ঞাসা করেন: হে আবুল হাসান! “সাওয়ামে’র আযান” কী? ইমাম বললেন: “অশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া অশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ”। তারপর যোগ করলেন: এ মুহাম্মাদ (সা.) আমার দাদা না তোমার দাদা? মুতাওয়াক্কিল পরাজয়ের সুরে বললেন: “হ্যাঁ, তিনি তোমার দাদা এবং আমরা এ সম্পর্ক অস্বীকার করি না।” (ইবনে শাহর আশুব, মানাকিব, খণ্ড ৪, পৃ. ৪০৬)
শাসনের সৃষ্ট সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রতিটি সুযোগে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কেরামত প্রকাশ এবং ইমামতের বিষয় আলোচনার মাধ্যমে ইমামতের গুরুত্ব তুলে ধরতেন। ইমামতের ব্যাখ্যা ও শিয়াদের ইমাম-চেতনা গভীর করার জন্য তাঁর দেওয়া ‘জিয়ারাতে জামেয়া কাবিরা’ একটি পূর্ণাঙ্গ ইমামতশাস্ত্র।
ইমাম হাদী (আ.) ইমামতের ব্যাখ্যার পাশাপাশি আব্বাসীয় শাসকদের খিলাফত অস্বীকার করেন এবং অত্যাবশ্যক ছাড়া তাদের সঙ্গে যে কোনো সহযোগিতা থেকে মুসলিমদের সতর্ক করেন। উদাহরণ: মুহাম্মাদ বিন ঈসা ইমামকে চিঠিতে জিজ্ঞাসা করেন, বনু আব্বাসের অধীনে চাকরি ও তাদের কাছ থেকে বেতন নেওয়া শরয়ী দৃষ্টিতে জায়েজ কি না। ইমাম উত্তর দেন: জোর-জবরদস্তিতে যা হয়, আল্লাহ ক্ষমা করেন, কিন্তু তার বাইরে তা অপছন্দনীয়; বাধ্য হয়ে হলে যত কম তত ভালো। পরে তিনি লেখেন: আমার উদ্দেশ্য তাদের ক্ষতি করা ও প্রতিশোধ নেওয়া। ইমাম উত্তর দেন: এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা শুধু হারাম নয়, বরং সাওয়াবের কারণ। (হুররে আমেলি, ওয়াসায়েলুশ শিয়া, খণ্ড ১২, পৃ. ১৩৭)
২. বিপথগামী দল ও চিন্তাধারার বিরুদ্ধে সংগ্রাম: ইমাম হাদী (আ.)-এর যুগে মতাদর্শিক ধারার উত্থান চরমে পৌঁছায়, যার ভিত্তি আব্বাসীয় শাসন তৈরি করেছিল। ইমামের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ষড়যন্ত্রের লাইন চিহ্নিত করত। যদিও কঠোর নজরদারি সমস্যা সৃষ্টি করেছিল, তবু ইমাম অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে এসব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার চেষ্টা করতেন।
৩. ওকালত নেটওয়ার্ক গঠন: শিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় ইমামের রাজনৈতিক সংগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল ছিল ওকালত নেটওয়ার্ক গঠন। পূর্ববর্তী মাসুমদের যুগেও ওকালতের নজির ছিল, কিন্তু ইমাম হাদী (আ.)-এর যুগে এ বিশাল বৈজ্ঞানিক, চিন্তাধারা ও রাজনৈতিক সংগঠন বিশেষ গুরুত্ব ও উজ্জ্বলতা লাভ করে।
ইমাম ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের অনুসারীদের মধ্যে অবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমের মতো দ্রুত ও সুসংগঠিতভাবে নির্ভরযোগ্য চ্যানেলের মাধ্যমে শিয়াদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিত, যা আহলে বাইতের অনুসারীদের জন্য নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল না এবং তাদের অবস্থান প্রকাশও করত না।
এ নেটওয়ার্ক মানুষের বৈজ্ঞানিক ও ফিকহী প্রয়োজন মূল উৎস থেকে পূরণ করত, যার প্রথম ফল ছিল মতাদর্শিক ও চিন্তাগত শুবহা দূরীকরণ। বিস্তৃত ওকালত নেটওয়ার্ক একটি বৃহৎ বৈজ্ঞানিক সংগঠনও ছিল যা পরবর্তীতে ফিকহ ও কালামের কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়।
এ প্রসঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেছেন: “শিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ইসলামী বিশ্বজুড়ে শিয়া সংগঠনের বিস্তার কোনো যুগেই ইমাম জাওয়াদ (আ.), ইমাম হাদী (আ.) ও ইমাম আসকারী (আ.)-এর যুগের মতো হয়নি। ওকিল ও নায়েবদের অস্তিত্ব এবং ইমাম হাদী ও আসকারী (আ.) থেকে বর্ণিত ঘটনাবলী (যেমন কেউ টাকা এনে দিলে ইমাম নির্দিষ্ট কাজের জন্য নির্দেশ দিতেন) এর প্রমাণ। অর্থাৎ সামাররায় এ দুই মহান ইমামের নজরবন্দি থাকা সত্ত্বেও এবং তার আগে ইমাম জাওয়াদ (আ.) ও ইমাম রেযা (আ.)-এর অনুরূপ অবস্থা সত্ত্বেও জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ইমাম রেযা (আ.)-এর আগেও এ যোগাযোগ ছিল, কিন্তু খোরাসানে তাঁর আগমন এতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।”
ইমাম হাদী (আ.) সঠিক চিন্তার ব্যাখ্যা, শুবহা ও বিপথগামিতা খণ্ডন, বিভিন্ন অঞ্চলে শিয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন এবং শিষ্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিয়াদের চিন্তাধারা, বিশ্বাস ও আমলের ব্যবস্থা সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর আচরণ থেকে বোঝা যায়, শিয়া ইমামরা সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও জ্ঞানের আলো ছড়ানো, হিদায়াত ও জালিম শাসনের মোকাবিলা থেকে পিছপা হননি এবং এ প্রচেষ্টা যুগের জটিল নীতি সম্পর্কে পূর্ণ সচেতনতার সঙ্গে যুক্ত ছিল। আজ ১২ শতাব্দী পরেও শিয়া ইমামদের বিপথগামী ধারার সঙ্গে মোকাবিলার পদ্ধতি বর্তমান বিপথগামিতার মোকাবিলার জন্য পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। 4324500#