IQNA

খ্রিস্টান চিন্তাবিদের সাক্ষাৎকারে ইকনার সাথে বললেন

হযরত ঈসা (আ.)-এর রিসালাত রাসূল (সা.)-এর আগমন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল

8:18 - December 25, 2025
সংবাদ: 3478670
ইকনা- লেবাননের খ্রিস্টান লেখক, কবি ও সাহিত্যিক মিশেল কা‘দি ইকনার সাথে সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, হযরত ঈসা (আ.)-এর পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের বহু সুসংবাদ রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যখন ঈসা (আ.) এই সুসংবাদ দেন, তখন তিনি নিজের রিসালাতকে একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করতে চান। তিনি আহমদের আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন কারণ তিনি চেয়েছিলেন যে, তাঁর পরবর্তীতে নৈতিক মূল্যবোধ খাতমুন নাবিয়্যীন (সা.)-এর আগমনের মাধ্যমে অব্যাহত থাকুক। উভয় নবীই নিজেদের রিসালাতকে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা ও আল্লাহর ভালোবাসা হিসেবে জানতেন।

মিশেল কা‘দি (জন্ম ১৯৪৪) লেবাননের খ্রিস্টান লেখক, কবি ও সাহিত্যিক। তিনি আরব বিশ্বের বিরল ও উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বদের একজন যিনি নিজের চিন্তাজীবনকে আহলে বাইত (আ.)-এর লেখনী ও প্রচারের জন্য উৎসর্গ করেছেন। একজন খ্রিস্টান চিন্তাবিদ হিসেবে তিনি আহলে বাইতকে “ক্বদিস” (পবিত্র) ও “আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তি” মনে করেন। তিনি ইমাম আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমা (সা.)-এর মতো ব্যক্তিত্বদের ওপর গভীর আধ্যাত্মিক বিষয়ে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে খ্রিস্টান ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ে সম্মানিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে এবং তাঁর রচনাবলী ধর্মীয় আন্তঃসংলাপ ও চিন্তাগত ঐক্যের এক উজ্জ্বল নমুনা হিসেবে পরিচিত।

আহলে বাইত (আ.) ও ইসলামী ব্যক্তিত্বদের প্রতি গভীর মনোযোগ সত্ত্বেও মিশেল কা‘দি একজন খাঁটি খ্রিস্টান হিসেবে হযরত ঈসা মসীহ (আ.) ও খ্রিস্টধর্মের শিক্ষার প্রতি এক অনন্য ও গভীর দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন যা শুধু কথাবার্তার সীমা অতিক্রম করে। খ্রিস্টধর্ম সম্পর্কে তাঁর চিন্তা পবিত্রতা ও ত্যাগের ধারণার ওপর ভিত্তি করে যা তাঁর সম্মানিত আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। তিনি হযরত ঈসা (আ.)-কে শুধু একজন নবী হিসেবে নয় বরং উচ্চতর মারেফাত ও পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে দেখেন, যা ইসলামে আল্লাহর ওলিদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধার সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনস্থল তৈরি করে। তাঁর লেখায় খ্রিস্টধর্মকে একটি সমৃদ্ধ আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে যার মূলে রয়েছে সত্যের অনুসন্ধান ও খাঁটি নৈতিকতা। এটি বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ায় সহায়তা করে, যেখানে ভালোবাসা ও ত্যাগ সকল আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তিদের রিসালাতের মূল অক্ষ।

ইকনা নিউজ এজেন্সি হযরত ঈসা মসীহ (আ.)-এর জন্মদিন ২৫ ডিসেম্বর (৪ জানুয়ারি) উপলক্ষে লেবাননের এই খ্রিস্টান চিন্তাবিদ, লেখক ও সাহিত্যিক মিশেল কা‘দির সাথে আন্তঃধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছে।

তিনি প্রথমে হযরত ঈসা মসীহ (আ.)-এর জন্মবার্ষিকীতে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন: এটা বলা জরুরি যে, খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম ঈমান ও তাওহীদের পথে একে অপরের সঙ্গী। “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বাক্যটি ইসলামের আগেও খ্রিস্টধর্মে বিদ্যমান ছিল। খ্রিস্টধর্ম ভুলে যায়নি যে, ইরানের সভ্যতাময় ভূমি থেকে তিন মগী হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্মের অভিনন্দন জানাতে বৈত লাহামে এসেছিলেন এবং উপহার নিয়ে এসেছিলেন। তারা প্রবেশ করামাত্র শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে নবজাতক ঈসা (আ.)-এর সামনে সিজদা করেছিলেন। এটা বলা জরুরি যে, খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, বিশেষ করে যখন আমরা স্বীকার করি যে আমরা সবাই আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম)। যে ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে সে নিঃসন্দেহে মুসলিম।

ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের মূলে রয়েছে তাওহীদ এই ভিত্তিতে আমি আমার বক্তৃতা ও লেখায়—যার সংখ্যা এগারো খণ্ডেরও বেশি—আহলে বাইত (আ.) সম্পর্কে বলি যে, আমরা সবাই আল্লাহর দরবারে মুসলিম এবং এই দুই ধর্মের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এখানে আমি ইরাকের সর্বোচ্চ শিয়া ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী সিস্তানির সাথে পোপের সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করি। এটি একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের মূলে রয়েছে ঐশী ভিত্তি, তাওহীদ এক এবং আমরা খ্রিস্টানরা ইসলামকে ভালোবাসি কারণ এটি তাওহীদ ও আল্লাহর উপাসনার প্রমাণ।

তিনি উল্লেখ করেন যে, অনেক খ্রিস্টান পাদ্রী সভ্য দেশ ইরান পরিবর্শন করেছেন এবং সেখানে বক্তৃতা দিয়েছেন। তিনি বলেন: আমরা খ্রিস্টানরা ৪০০-এরও বেশি লেখক, কবি ও ঐতিহাসিকের গর্ব করি যারা আহলে বাইত (আ.) সম্পর্কে বই লিখেছেন এবং ইসলামের পবিত্রতা ও রাসূল (সা.)-এর প্রতি স্বীকৃতি জানিয়েছেন যিনি মূর্তি ও মূর্তিপূজাকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” ও তাওহীদের পতাকাতলে ধ্বংস করেছেন। সবশেষে আমি বলি যে, তাওহীদ ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের মূল ভিত্তি।

মিশেল কা‘দি আরও বলেন: আমি স্বীকার করছি যে, আমি হযরত ঈসা (আ.)-কে কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে চিনেছি—পশ্চিমা লোকেরা তাঁকে জাল ইঞ্জিলের বর্ণনায় যেভাবে চিত্রিত করেছে বা তাঁর সম্পর্কে সন্দেহ ও শঙ্কার গল্প পড়ার আগেই। আমি কুরআন সাতবার পূর্ণ পড়ার পর বুঝেছি যে, আল্লাহ হযরত মসীহ সম্পর্কে বলেছেন তিনি শান্তির রাসূল ও পৃথিবীতে আল্লাহর প্রেরিত।

তিনি ব্যাখ্যা করেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) ও হযরত ঈসা (আ.)-উভয়ের ব্যক্তিত্ব আল্লাহর ঐশ্বরিক সত্ত্বা থেকে উৎসারিত এবং পৃথিবীতে প্রেরিত। যেমন আল্লাহ তা‘আলা সূরা মারিয়ামের ৩৩ নম্বর আয়াতে বলেছেন: «وَالسَّلَامُ عَلَيَّ يَوْمَ وُلِدْتُ وَيَوْمَ أَمُوتُ وَيَوْمَ أُبْعَثُ حَيًّا» অর্থাৎ “আমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় পুনরুত্থিত হব।” এই আয়াত সুন্দরভাবে বর্ণনা করে যে, হযরত ঈসা (আ.)-এর জন্ম পবিত্র ও পরিশুদ্ধ ছিল—যেমনটা খ্রিস্টধর্মে বলা হয়। এই ভিত্তিতে আমি বিশ্বাস করি যে, ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের মূল এক এবং উভয় ধর্ম একই পথের।

ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের মিলনস্থল এই খ্রিস্টান চিন্তাবিদ আরও বলেন: হযরত ঈসা (আ.)-এর মানবীয় ভিত্তি সম্পর্কে বলতে গেলে, তিনি জন্মের পর থেকেই মানবীয় মূল্যবোধ প্রকাশ করেছেন এবং পরবর্তী জীবনে মানুষের জন্য তা ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি মানবজাতির অনেক অনৈতিক অভ্যাস পরিবর্তন করেছেন এবং তাতে ঐশী মর্যাদা দিয়েছেন। তাই আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সারা বিশ্বকে ঘোষণা করা উচিত যে, আমরা ঈসা (আ.) সম্পর্কে যা জানি ও চিনি তা কুরআনে ঠিক একইভাবে বর্ণিত আছে। যেমন হযরত ঈসা (আ.)-এর আল্লাহর বান্দাদের প্রতি ভালোবাসা, সমতা ও ন্যায়ের জন্য তাঁর আওয়াজ এবং মানবীয় ও সামাজিক বিষয় যা তিনি মানুষকে পরিচালিত করেছেন—সবই মানুষের উন্নতি ও পরিপূর্ণতার জন্য ছিল যাতে মানবজাতি থেকে একটি উৎকৃষ্ট নমুনা মানুষের আদর্শ গড়ে তোলা যায়।

মিশেল কা‘দি বলেন: অন্ততপক্ষে খ্রিস্টধর্ম যে মানবীয় মূল্যবোধের ডাক দিয়েছে তা অনুসরণ করে আমাদের একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ও মহব্বত শিখতে হবে। মানুষকে এটা বোঝা উচিত যে, সকল মানব সমাজের ভিত্তি হলো সহমর্মিতা ও ভালোবাসা। এটাই হযরত ঈসা (আ.)-এর ডাক ছিল এবং কুরআনেও এর প্রতি আহ্বান করা হয়েছে। তাই আমি বলেছি যে, আমি কুরআনের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্মকে চিনেছি।

এই লেবাননি সাহিত্যিক দুই উলুল আযম নবী হযরত ঈসা (আ.) ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মানব গঠন ও আল্লাহর মূল্যবোধভিত্তিক প্রকৃতি গড়ে তোলার রিসালাতের কথা উল্লেখ করে বলেন: হযরত ঈসা (আ.)-এর অলৌকিক জন্ম এবং জন্মের পর গায়ে স্বাভাবিক কথা বলা এই ঐশী রাসূলের রিসালাতের মহত্ত্ব প্রকাশ করে। তিনি জন্মের পর থেকেই মানুষের হিদায়াতের জন্য প্রেরিত হন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত হয়ে কথা বলতে শুরু করেন। ঠিক তেমনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-ও তাঁর ওপর অবতীর্ণ আয়াতের মাধ্যমে মানুষের জন্য রিসালাত বর্ণনা করেন। অতএব ঈসা (আ.) ও মুহাম্মদ (সা.) উভয়ই আল্লাহর মনোনীত ও নির্বাচিত বান্দা যাঁরা মানবতাকে তার সকল অর্থ ও বিস্তারিত বিষয়সহ উপস্থাপন করেছেন।

আসমানী রিসালাতে কোনো পার্থক্য নেই মিশেল কা‘দি বলেন: কুরআন ও ইঞ্জিল উভয়ই আসমানী গ্রন্থ যা মানব গঠন ও মানবীয় মূল্যবোধের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে পরিপূর্ণ। এই দুই গ্রন্থের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো পরস্পরের প্রতি সম্মান ও বোঝাপড়া যাতে মানুষকে চূড়ান্ত লক্ষ্য—অর্থাৎ আল্লাহর মহব্বত, ইশক-ই-ইলাহী ও সত্যের উদাহরণে পৌঁছানো যায়। উভয় রাসূলই নিজেদের পুরো জীবন এই রিসালাতের জন্য উৎসর্গ করেছেন যে, মানুষকে পরিপূর্ণতায় পৌঁছান। হযরত ঈসা ও রাসূল (সা.) উভয়ই নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেছেন—যেমন ইসলামেও এই অর্থ রয়েছে।

তিনি বলেন: হযরত ঈসা (আ.)-এর পক্ষ থেকে রাসূল (সা.)-এর আগমনের বহু সুসংবাদ রয়েছে। যখন তিনি এই সুসংবাদ দেন তখন তিনি চান যে, তাঁর রিসালাত অব্যাহত থাকুক। তিনি আহমদ অর্থাৎ আল্লাহর মনোনীত ও প্রশংসিত ব্যক্তির আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন যাতে তাঁর পরে নৈতিক মূল্যবোধ খাতমুন নাবিয়্যীন (সা.)-এর আগমনের মাধ্যমে অব্যাহত থাকে। যেমন সূরা তাওবার ১২৮ নম্বর আয়াতে আছে: «لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ» অর্থাৎ: “নিশ্চয়ই তোমাদের কাছে এসেছেন একজন রাসূল তোমাদের মধ্য থেকে, যাঁর ওপর তোমাদের কষ্ট সহ্য করা কঠিন, তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও করুণাময়।”

মিশেল কা‘দি শেষে জোর দিয়ে বলেন: আসমানী ধর্ম ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের রিসালাতের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা উচিত নয় কারণ উভয়ের লক্ষ্য হলো ভালোবাসা, আল্লাহর প্রতি মহব্বত ও রহমত। যেমন কুরআনে সূরা কাহফের ১১০ নম্বর আয়াতে আছে: «قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا» অর্থাৎ: বলো, আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী হয় যে, তোমাদের ইলাহ একমাত্র ইলাহ। অতএব যে ব্যক্তি তার রবের সাক্ষাতের আশা করে সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে। 4324753# 

ট্যাগ্সসমূহ: আল্লাহ ، ইমাম
captcha