IQNA

মুবাহালা: একটি ঘটনার চেয়েও বৃহত্তর — ওলায়াতের সামনে আত্মসমর্পণ ও ইবলিসী অহংকার থেকে মুক্তির পরীক্ষা

14:56 - June 10, 2026
সংবাদ: 3479286
আইয়ামে মুবাহালা শুধু মদিনায় ঘটে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতিচারণ নয়, বরং সৃষ্টিতত্ত্ব ও হেদায়েতের মৌলিক সত্যসমূহ অনুধাবনের এক উন্মুক্ত দুয়ার। ইমাম রেজা (আ.)-এর মামুনের জবাব থেকে শুরু করে খুতবায়ে কাসেয়ার বিশ্লেষণ — সবকিছুর মধ্য দিয়ে “হুজ্জত” ও “ওলায়াত”-এর এক অবিচ্ছিন্ন সূত্র অনুসরণ করা যায়।

মুবাহালা: একটি ঘটনার চেয়েও বৃহত্তর — ওলায়াতের সামনে আত্মসমর্পণ ও ইবলিসী অহংকার থেকে মুক্তির পরীক্ষাএই প্রেক্ষাপটে, দিবসে মুবাহালা উপলক্ষে ইকনার চিন্তা বিভাগ হুজ্জাতুল ইসলাম হোসাইন আশহাদ (যিনি একজন বিশিষ্ট আলেম ও অধ্যাপক)-এর সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই মূল বিষয়টি তুলে ধরেছে যে, আহলে বাইত (আ.)-এর ওলায়াত গ্রহণ করাই ইবলিসের পুনরাবৃত্তিযোগ্য অহংকারের পথ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়। কেন আয়াতে মুবাহালা আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর শ্রেষ্ঠত্বের সর্বোচ্চ প্রমাণ? আর এই ওলায়াত অস্বীকারের মূল কারণ কোথায় অনুসন্ধান করতে হবে? — “ইবলিসের রোগ”-এর মধ্যেই।

তিনি এই আলোচনায় আয়াতে মুবাহালার তাফসিরী দিক, হযরত আদম (আ.)-এর সত্তায় আহলে বাইতের নূরের উপস্থিতি এবং আল্লাহর ওলায়াত ও তাগুতের মধ্যে চিরন্তন সংঘাতের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেছেন। নিম্নে তাঁর বক্তব্যের বিস্তারিত দেওয়া হলো:

যে আয়াতগুলো আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে ব্যবহৃত হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আয়াতে মুবাহালা (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৬১)। মহান আল্লাহ এখানে ইরশাদ করেন:

: «فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ».

যারা তোমার কাছে জ্ঞান আসার পরও তোমার সঙ্গে এ বিষয়ে বিতর্ক করে, তাদের বলো: এসো, আমরা আমাদের সন্তানদের ডাকি, তোমাদের সন্তানদের ডাক, আমাদের নারীদের ডাকি, তোমাদের নারীদের ডাক, আমাদের নিজের স্বত্তাদের ডাকি, তোমাদের নিজের স্বত্তাদের ডাক। তারপর আমরা মুবাহালা (পারস্পরিক অভিশাপ) করি এবং মিথ্যাবাদীদের উপর আল্লাহর লানত বর্ষণ করি।

এ প্রসঙ্গে মরহুম শেখ মুফিদ (রহ.) তাঁর গ্রন্থ ফুসুলুল মুখতারা”-য় একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। সেখানে মামুন আব্বাসী ইমাম রেজা (আ.)-কে জিজ্ঞাসা করেন: আমাকে বলুন, কুরআন মজীদে আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে সবচেয়ে বড় দলিল কোন আয়াত?” ইমাম রেজা (আ.) সরাসরি আয়াতে মুবাহালা-র দিকে ইঙ্গিত করেন।

এই আয়াতের সঠিক বিশ্লেষণে সাধারণত তিনটি ধাপ অনুসরণ করা হয়: প্রথমে শব্দগত (ভাষাতাত্ত্বিক) আলোচনা, তারপর শানে নুজুল (অবতরণের প্রেক্ষাপট) এবং অবশেষে আয়াতের দলিলিক বিশ্লেষণ।

আয়াতের মূল চাবিকাঠি শব্দ হলো ثُمَّ نَبْتَهِلْযা মুবাহালাশব্দের উৎস। ভাষাবিদগণ এর মূলকে بَهَلَবা بَهْلَةথেকে উদ্ভূত বলেছেন, যার অর্থ অভিশাপ ও লানত। মুবাহালা তখনই হয় যখন দুই পক্ষ দীর্ঘ বিতর্ক ও দলিল-প্রমাণ উপস্থাপনের পরও একে অপরকে সত্য মেনে নিতে ব্যর্থ হয়। তখন তারা আল্লাহর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে: হে আল্লাহ! আমরা যা বলার বলেছি, কিন্তু অপর পক্ষ মানছে না। অতএব যে মিথ্যা বলছে এবং তাতে অটল রয়েছে, তাকে তুমি লানত করো এবং শাস্তি দাও।

এই পবিত্র আয়াতের শানে নুজুল সম্পর্কিত বর্ণনাগুলো মোটামুটি সকল সূত্রে প্রায় একই রকম এবং ফিরক্বায়ে বিভক্ত হওয়া সত্ত্বেও উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সাধারণ ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে বিস্তারিত কিছু বিষয়ে অবশ্যই মতপার্থক্য রয়েছে।

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুসারে, রাসূলুল্লাহ (সা.) আশপাশের গোত্রপ্রধানদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তাদের সত্য ও তাওহীদের দিকে দাওয়াত দেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল নজরান অঞ্চলের অধিবাসীরা, যারা সকলে খ্রিস্টধর্মাবলম্বী ছিল এবং বাণিজ্যে অত্যন্ত দক্ষ ও সম্পদশালী ছিল। এই দাওয়াতের জবাবে তাদের তিনজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বিষয়টি যাচাই করার জন্য মদিনায় আসেন। বর্ণনা অনুসারে, তারা মূল্যবান অলংকার ও বিলাসবহুল পোশাক পরে এসেছিলেন।

মদিনায় প্রবেশের সময় শহরের কিছু লোক তাদের সঙ্গ দেন এবং তারা মসজিদে প্রবেশ করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু প্রথমে নবী করীম (সা.) তাদের প্রতি বিশেষ কোনো গুরুত্ব দেননি। কিছু বর্ণনায় আছে, তারা এই অবহেলার কারণ জানতে চাইলে তাদের বলা হয় যে, তাদের অতিরিক্ত আড়ম্বরপূর্ণ পোশাক ও অলংকারের কারণেই নবী (সা.) তাদের সঙ্গে কথা বলছেন না। তাদের উচিত সাধারণ পোশাকে আসা।

এরপর নজরানের প্রতিনিধিরা সাধারণ পোশাক পরে এসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে আলোচনায় বসেন। তারা পূর্ববর্তী নবীদের সম্পর্কে প্রশ্ন করেন এবং অবশেষে হযরত ঈসা (আ.) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন। তারা দাবি করেন যে, হযরত ঈসা (আ.) আল্লাহর পুত্র, কারণ হযরত মরিয়ম (আ.)-এর কোনো স্বামী ছিল না এবং তাদের মতে বিনা পিতায় কোনো মানুষের জন্ম হওয়া অসম্ভব।

এই দাবির জবাবে একটি পবিত্র আয়াত নাজিল হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের বলেন যে, হযরত ঈসা (আ.)-এর উদাহরণ হযরত আদম (আ.)-এর মতো। কারণ আদম (আ.)-কেও বিনা পিতায় সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আল্লাহ তাঁকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। এই যুক্তি উপস্থাপন করা সত্ত্বেও তারা সত্য গ্রহণ করেনি। রাসূলুল্লাহ (সা.) যতই দলিল-প্রমাণ পেশ করেছেন, তারা ততই তাদের বিশ্বাসে অটল থেকেছেন। অবশেষে এই বাতিলের উপর জেদের কারণে মুবাহালার প্রস্তাব আসে এবং পবিত্র আয়াত নাজিল হয়: ফামান হাজ্জাকা ফীহি... (অতএব যে ব্যক্তি তোমার কাছে জ্ঞান আসার পরও তোমার সঙ্গে এ বিষয়ে বিতর্ক করে...)। প্রকৃতপক্ষে, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের কাছে জ্ঞান ও দলিল পৌঁছে দিয়েছিলেন, কিন্তু তারা তবুও অস্বীকারের উপর অটল ছিল।

মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য সৃষ্টির শুরু থেকেই কিছু সামর্থ্য ও উপায় সৃষ্টি করে দিয়েছেন, যাকে ধর্মীয় পরিভাষায় হুজ্জত বলা হয়। এই হুজ্জত দুপ্রকার: প্রথমটি অভ্যন্তরীণ হুজ্জত, যা আকল (বিবেক-বুদ্ধি), আর দ্বিতীয়টি বাহ্যিক হুজ্জত, যা নবী-রাসূল, আউলিয়া ও ইমামগণ (আ.)-এর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

এখানে আহলে বাইত (আ.)-এর রেওয়ায়েতসমূহে আকল’-এর স্বরূপ ও তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে, আমরা এই দুধরনের হুজ্জতের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করব।

যেহেতু উভয় হুজ্জতের উৎস ও লক্ষ্য একই এবং উভয়ই মানুষকে হেদায়েতের পথে পরিচালিত করে, তাই তাদের মধ্যে কোনো ধরনের বৈপরীত্য বা সংঘাতের অবকাশ নেই। এটা অসম্ভব যে, অভ্যন্তরীণ হুজ্জত একদিকে মানুষকে ডাকবে আর বাহ্যিক হুজ্জত তাকে অন্যদিকে নিয়ে যাবে। এ কারণেই নবীগণের প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের অন্তরের উপর জমে থাকা বস্তুবাদী ধুলো-ময়লা পরিষ্কার করা। প্রকৃতপক্ষে, নবী-রাসূলগণ এসেছেন এই প্রতিবন্ধকতাগুলো সরিয়ে দিতে, যাতে মানুষের আকল জাগ্রত হয় এবং সে নবীর সত্যতা, তাঁর মুজেযাসমূহ এবং অবশেষে মহান আল্লাহকে চিনতে পারে ও ঈমান আনতে সক্ষম হয়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) পূর্ণ হুজ্জত কায়েম করেছিলেন এবং প্রয়োজনীয় সকল দলিল-প্রমাণ পেশ করেছিলেন। যেমন সূরা মায়েদার শেষ আয়াতসমূহে এসেছে, সকল নবীর দায়িত্ব ছিল সত্যকে পূর্ণরূপে পৌঁছে দেওয়া এবং কেউই আল্লাহর বার্তা পৌঁছাতে কোনো ত্রুটি করেননি। কিন্তু বিপরীত পক্ষ শুধু সত্য গ্রহণ করেনি, বরং নিজেদের বাতিল বিশ্বাসের উপর জেদ ধরে ছিল। ফলে সিদ্ধান্ত হয় যে, বিষয়টি মুবাহালার মাধ্যমে মীমাংসা করা হবে এবং এজন্য নির্দিষ্ট সময় ও স্থান নির্ধারণ করা হয়।

 

নজরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে একজন বিচক্ষণ ও জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তাঁর সঙ্গীদের সতর্ক করে বলেছিলেন: যদি আমরা মুবাহালা করি এবং বিপক্ষ যদি মিথ্যাবাদী হয়, তাহলে আমাদের কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু যদি তিনি সত্যবাদী হন, তবে আমরা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যাব।

তিনি আরও একটি কৌশলের প্রস্তাব দেন যাতে সত্যতা যাচাই করা যায়: যদি এই ব্যক্তি তাঁর সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে মুবাহালার ময়দানে আসেন, তাহলে তা গ্রহণ করো। কিন্তু যদি তিনি তাঁর পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে আসেন, তবে কোনোভাবেই তা গ্রহণ করো না। কারণ কেউ নিজের সবচেয়ে প্রিয়জনদের বিপদের মুখে ঠেলে দেয় না, যদি না সে নিজের পথের সত্যতা সম্পর্কে পূর্ণ বিশ্বাসী হয়।

এই সমস্ত ঘটনা আয়াতে মুবাহালার তাফসির ও রেওয়ায়েতসমূহে বর্ণিত হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.), তাঁর দুই প্রিয় নাতি ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) ও সাইয়্যেদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইন (আ.) এবং হযরত সিদ্দীকাহ তাহেরা ফাতিমাহ যাহরা (সা.)-কে সঙ্গে নিয়ে আগমন করেন। পথে তাঁরা একটি গাছের নিকট পৌঁছালে তার ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন।

ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর প্রতি সম্বন্ধিত একটি তাফসিরে বর্ণিত হয়েছে যে, নির্ধারিত সময়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) নজরানের প্রতিনিধিদের ডেকে বললেন: হালুম্মুল আন «هَلُمُّ الآن»  (এসো, এখন মুবাহালা করি এবং দোয়া করি যে, যে মিথ্যা বলেছে তার উপর আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক)।

এ সময় নজরানের প্রতিনিধিরা তাদের নেতার সেই সতর্কবাণী স্মরণ করলেন, যিনি বলেছিলেনযদি নবী (সা.) তাঁর নিকটাত্মীয়দের নিয়ে আসেন, তবে মুবাহালা গ্রহণ না করতে। যেহেতু রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এসেছিলেন, তাই তারা মুবাহালা করতে অস্বীকৃতি জানায়।

রাসূলুল্লাহ (সা.) তখন দোয়ার জন্য তাঁর পবিত্র হাত দুটি আকাশের দিকে তুলে ধরেছিলেন। এ অবস্থায় তারা ঘোষণা করে যে, তারা না মুসলমান হবে, না মুবাহালা করবে। অবশ্য কিছু বর্ণনায় আছে যে, তাদের মধ্যে কয়েকজন বড় ও ছোট ব্যক্তি এই ঘটনায় প্রভাবিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন, কিন্তু অধিকাংশই মুসলমান হননি। শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, এ অবস্থায় তাদেরকে জিযিয়া দিতে হবে। তারা তা মেনে নেয় এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে চুক্তি করে।

ইমাম হাসান আসকারী (আ.)-এর প্রতি সম্বন্ধিত তাফসিরে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর পবিত্র হাত দুটি দোয়ার জন্য উত্থিত করে বলতে শুরু করেন: اللهم هذا نفسی  আল্লাহুম্মা হাযা নাফসী (হে আল্লাহ! এই তো আমার নিজের সত্তা...)।

«انفسنا و انفسکم এখানে নাফসশব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। সাধারণ অনুবাদে অনেক সময় নাফসকে প্রাণবলা হয়, কিন্তু এখানে এই অনুবাদ সঠিক নয়। কারণ প্রাণশব্দটি রূহ”-এর সমার্থক, অথচ নাফস”-এর অর্থ হলো মানুষের সত্তা ও স্বয়ং সত্তা। সুতরাং হাযা নাফসীঅর্থ হলো আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.) আসলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এরই নিজ সত্তা।

আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব এই আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এই বাণীর মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কারণ তিনি তাঁর সমস্ত সাহাবীদের মধ্য থেকে তাদের মর্যাদা যাই হোক না কেন শুধুমাত্র হযরত আলী (আ.)-কেই বেছে নিয়ে বলেছিলেন: আমি নিজেকে নিয়ে আসছি। এছাড়া তিনি তাঁর সন্তানদের এবং সর্বশেষ ইসলামের মহীয়সী নারী হযরত সিদ্দীকাহ তাহেরা (সা.)-কেও সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, আয়াতে নিসাশব্দটির অর্থ স্ত্রীগণনয়। কেউ কেউ কিছু দুর্বল রেওয়ায়েতের উপর ভিত্তি করে মনে করেন যে, এখানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যান্য স্ত্রীদের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, “নিসায়ানাএখানে শুধুমাত্র হযরত সিদ্দীকাহ তাহেরা ফাতিমাহ যাহরা (সা.)-এর দিকে ইঙ্গিত করছে, যিনি সমস্ত বিশ্বের নারীদের সর্দার।

রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর পবিত্র হাত দুটি আকাশের দিকে তুলে দোয়া করতে করতে বলেছিলেন: «اللهم هذا نفسی» আল্লাহুম্মা হাযা নাফসী” (হে আল্লাহ! এই তো আমার নিজ সত্তা)।

এই কথার মাধ্যমে তিনি আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর সঙ্গে তাঁর নিজের অভিন্নতা ও আত্মিক যোগসূত্র ঘোষণা করেছেন। তারপর বলেছেন:

«اللهم هذا نسائی افضل نساء العالمین» আল্লাহুম্মা হাযা নিসায়ী আফদালু নিসায়িল আলামীন” (হে আল্লাহ! এই তো আমার নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ নারী, যিনি সমস্ত বিশ্বের নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ) এবং এর দ্বারা তিনি হযরত সিদ্দীকাহ তাহেরা (সা.)-কে বুঝিয়েছেন।

এরপর তিনি তাঁর দুই প্রিয় নাতির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন: «هذان ولدای و سبتای...»

হাযানি ওয়ালাদায়্যা ওয়া সিবতায়্যা...” (এঁরা আমার দুই পুত্র ও নাতি...)।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এই মহান ব্যক্তিবর্গকে সঙ্গে নিয়ে মুবাহালার জন্য এসেছিলেন। তিনি ময়দান ত্যাগ করার পূর্বে একটি সামগ্রিক দোয়া করেন: : «فانا حرب لمن حاربکم...»

ফাআনা হারবুন লিমান হারাবাকুম...” (যে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে, আমিও তার সঙ্গে যুদ্ধ করব)।

এই দোয়াটিকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও তাদের শত্রুদের প্রতি শত্রুতার বিষয়ক অন্যান্য বাণীর সঙ্গে একত্রে দেখতে হবে। তিনি মূলত বলেছেন যে, যে ব্যক্তি এই চারজনের (আহলে বাইত) সঙ্গে শান্তি ও বন্ধুত্ব রাখবে, সে আসলে আমার সঙ্গে শান্তি রাখবে। এই রেওয়ায়েতটি আয়াতে মুবাহালার শানে নুজুল ও সত্যতা তুলে ধরে এবং ইসমতের খান্দানের উচ্চ মর্যাদার প্রতি জোর দেয়।

 

আয়াতের দলিলিক তাৎপর্য:

শেখ সাদুক (রহ.) তাঁর গ্রন্থ আমালী”-র ৭৯তম মজলিসের প্রথম হাদিসে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। এই বর্ণনায় ইমাম রেজা (আ.)-এর সঙ্গে মামুন আব্বাসীর মজলিসে অনুষ্ঠিত একটি বিতর্কের দৃশ্য বর্ণিত হয়েছে। মামুন মার্ভ শহরে এক বিশেষ মজলিসের আয়োজন করেছিলেন, যেখানে তিনি কুরআনের আয়াতসমূহ এবং আহলে বাইত (আ.)-এর মর্যাদা সম্পর্কে ইমাম (আ.)-এর কাছে প্রশ্ন করেন।

এই মজলিসে মামুন একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেন: আল্লাহ কি তাঁর নবীর বংশধরদের (আহলে বাইত) অন্যান্য মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন?” (هل فضل الله عتره علی سائر الناس؟) ইমাম রেজা (আ.) উত্তরে বলেন: হ্যাঁ, মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবের সুস্পষ্ট আয়াতসমূহে আহলে বাইতের শ্রেষ্ঠত্ব অন্যান্য মানুষের উপর প্রকাশ করে দিয়েছেন।

মামুন যখন জিজ্ঞাসা করলেন যে, আল্লাহর কিতাবে এই শ্রেষ্ঠত্ব কোথায় উল্লেখিত হয়েছে, তখন ইমাম (আ.) একাধিক আয়াত উল্লেখ করেন; যার মধ্যে আয়াতুল উলিল আমর اولوالامر এবং আয়াত আম ইয়াহসুদুনান্নাসام یحسدوا الناس অন্যতম। এ সময় উপস্থিত আলেমগণ প্রশ্ন করেন: আল্লাহ কি কুরআনে এই মনোনীত ব্যক্তিদের সুস্পষ্টভাবে পরিচয় দিয়েছেন? ইমাম রেজা (আ.) উত্তরে বলেন: হ্যাঁ, বারোটি আয়াতে এই শ্রেষ্ঠত্ব স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, যার মধ্যে আয়াতে মুবাহালা তৃতীয় আয়াত।

আয়াতের বাস্তবায়ন: রাসূলুল্লাহ (সা.) মুবাহালার সময় কাদের সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন? তিনি হযরত আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.), হযরত সিদ্দীকাহ তাহেরা (সা.) এবং দুই ইমাম হাসান ও হুসাইন (আ.)-কে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। যাঁরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দৃষ্টিতে সকলেই তাঁরই নাফস ও সত্তা।

আনফুসানা انفسنا শব্দটির ব্যাখ্যায় যদি কেউ মনে করেন যে, এটি শুধু রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিজের দিকে ইঙ্গিত করছে, তবে তা ভুল ও বিষয়ের গুলিয়ে ফেলা। ইমাম রেজা (আ.) এই সত্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বনু ওয়ালীআহ «بنو ولیعه» গোত্রের কাছে একজন দূত পাঠানোর ইচ্ছা করেন। সে সময় তিনি আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন: আমি তোমাদের কাছে এমন ব্যক্তিকে পাঠাচ্ছি যিনি আমারই নিজ সত্তা

এই বাণী প্রমাণ করে যে, এটি একটি অনন্য ও অতুলনীয় মর্যাদা, যা আর কারো জন্য প্রযোজ্য নয়। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, হযরত আলী (আ.) আসলে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এরই নিজ সত্তা

সুতরাং, এই পবিত্র আয়াত নাজিল হওয়ার দিন, অর্থাৎ ২৪ জিলহজ্জকে একটি মহান উৎসব হিসেবে পালন করা উচিত।

কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে: যদিও আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.) ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বংশধরদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের স্পষ্ট দলিল-প্রমাণ উপস্থাপিত হয়েছে, তবুও কেন কিছু মানুষ এই সত্যের সামনে মাথা নত করে না এবং হক গ্রহণ করে না?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয় মনস্তাত্ত্বিক ও কালামী বিশ্লেষণের মাধ্যমে যার নাম تکبر তাকাব্বুর (অহংকার)। এটি ঠিক সেই অবস্থা যা ইবলিস হযরত আদম (আ.)-কে সিজদা করার নির্দেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। যেমন কুরআনে এসেছে: : «فَسَجَدُوا كُلُّهُمْ إِلَّا إِبْلِيسَ  ফাসাজাদু কুল্লুহুম ইল্লা ইবলীস (সকলে সিজদা করল, শুধু ইবলিস ছাড়া)। ইবলিস একটি বাহ্যিক ও বস্তুগত যুক্তির উপর ভিত্তি করে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করেছিল এবং বলেছিল: «أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍআনা খাইরুম মিনহু খালাকতানী মিন নারিন ওয়া খালাকতাহু মিন ত্বীন (আমি তার চেয়ে উত্তম; তুমি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছ আর তাকে মাটি থেকে)।

প্রকৃতপক্ষে, সত্য গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের মূল কারণ হলো তাকাব্বুর তাআব্বুদ (আত্মসমর্পণ)-এর মধ্যকার সংঘাত। যেমন ইবলিস অহংকারের কারণে হযরত আদম (আ.)-এর মর্যাদার সত্যকে অস্বীকার করেছিল, তেমনি কিছু মানুষও অহংকার ও বস্তুগত পূর্বধারণার কারণে ইসমতের খান্দানের শ্রেষ্ঠত্বের সামনে মাথা নত করে না। এই পথের পরিণতি সেইটাই যা আল্লাহ ইবলিস সম্পর্কে বলেছেন: فَأَنتَ رَجِيمٌ ফাআনতা রাজীম (সুতরাং তুমি অভিশপ্ত ও বিতাড়িত)।

শেখ সাদুক (রহ.) তাঁর মহান গ্রন্থ কামালুদ্দীন ওয়া তামামুন নিমাহ”-এর ভূমিকায় লিখেছেন যে, ইবলিস হযরত আদম (আ.)-কে সিজদা না করার মূল কারণ ছিল হযরত আদমের সত্তায় পবিত্র নূরের উপস্থিতি। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, আল্লাহ তাআলা আহলে বাইত (আ.)-এর নূর হযরত আদম (আ.)-এর মধ্যে স্থাপন করেছিলেন। ইবলিস এই নূর দেখে শুধু সিজদা করেনি, বরং দীর্ঘকালের ইবাদতের অহংকারে মনে করেছিল যে, সে এই পবিত্র নূর বহন করার যোগ্যতর।

সুতরাং বোঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিরুদ্ধে প্রথম বিরোধিতা আসলে  «ولایت خلیفة‌ الله» খলীফাতুল্লাহের ওলায়াত ও আহলে বাইত (আ.)-এর ওলায়াতের বিরুদ্ধেই ছিল। আল্লাহ তাআলা এই বিদ্রোহ কখনো মেনে নেন না। তাই তিনি ইবলিসকে তাঁর রহমতের দরবার থেকে বিতাড়িত করেন এবং তাকে রাজীম (অভিশপ্ত) বলে ঘোষণা করেন যতক্ষণ না এই ওলায়াতের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই বিরোধিতার ধারা গাদীরের পরবর্তী ইতিহাসেও পুনরাবৃত্তি হয়েছে। কারণ কিছু লোক আবারও এই ঐশী ওলায়াতকে অস্বীকার করেছে। এ প্রসঙ্গে সূরা মাআরিজের معارج প্রথমাংশের আয়াতসমূহের প্রতি ইঙ্গিত করা যায়, যেখানে যারা এই সত্য ও ওলায়াতকে প্রকাশ্যে অস্বীকার করেছে, তাদের আল্লাহর গজব ও শাস্তির কথা বলা হয়েছে।

এই সত্যের ব্যাখ্যায় দুটি মৌলিক বিষয় রয়েছে:

প্রথমত, ওলায়াতের প্রস্তাবনা বিষয়টি। মহান আল্লাহ সূরা মায়েদার ৫৫ ও ৫৬ নম্বর আয়াতে ওলায়াতের সত্যকে এভাবে তুলে ধরেছেন: «إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَ رَسُولُهُ وَ الَّذِينَ آمَنُوا ইন্নামা ওয়ালিয়্যুকুমুল্লাহু ওয়া রাসূলুহু ওয়াল্লাজীনা আমানু... (তোমাদের একমাত্র অভিভাবক ও মনিব হলেন আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং যারা ঈমান এনেছে...)।

প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ মুমিন সমাজকে ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, তারা আল্লাহর ওলায়াত, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওলায়াত এবং আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর ওলায়াতের অধীন। কারণ মানুষ বন্দেগি” (আবেদিয়াত)-এর গুণের কারণে স্বভাবতই একজন অভিভাবক ও হেদায়েতকারীর প্রয়োজন রাখে।

দুনিয়াতে মূলত দুধরনের ওলায়াতই বিদ্যমান: প্রথম, আল্লাহর পরম ওলায়াত এবং তাঁর উত্তরাধিকারীগণের ওলায়াত; দ্বিতীয়, তাগুতের ওলায়াত। যেমন আয়াতুল কুরসীসহ অন্যান্য আয়াতে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যারা কুফর অবলম্বন করে, তারা তাগুতকে নিজেদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে। আর এই তাগুতের প্রতীক ও নেতা হলেন ইবলিস। আল্লাহর ওলায়াত গ্রহণ করলে মানুষ আল্লাহর বন্ধু ও দলভুক্তহয়ে যায়। আর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এই জোট সর্বদা বিজয়ী।

দ্বিতীয় মৌলিক বিষয় হলো, আল্লাহর ইচ্ছা হলো সৃষ্টি, বন্দেগি ও হেদায়েত। আর এই হেদায়েত কেবল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ঈমান এবং আহলে বাইত (আ.)-এর ওলায়াত গ্রহণের মাধ্যমেই লাভ করা সম্ভব। এখানে মূল প্রশ্ন হলো এই শ্রেষ্ঠত্ব গ্রহণ করা। অনেক অস্বীকারকারী আসলে আহলে বাইতের শ্রেষ্ঠত্ব উপলব্ধি করতে পারে, কিন্তু নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করা এবং অহংকারের ব্যাধির কারণে যা ইবলিসের কর্মের মূল কারণ তারা সত্যের সামনে আত্মসমর্পণ করতে এবং মাথা নত করতে প্রস্তুত হয় না।

এ প্রসঙ্গে আমি আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর খুতবায়ে কাসেয়ার দিকে ইঙ্গিত করতে চাই। এই খুতবার কিছু অংশ আমার কাছে এক অমূল্য শিক্ষা ও উপদেশ যাতে আমি সেই **ওলায়াতের মণি”**র রক্ষক হতে পারি, যা মহান আল্লাহ আমার অস্তিত্বে স্থাপন করেছেন। এটি এমন এক অমূল্য সম্পদ যা যদি আমি জীবনের পথে সঙ্গে রাখতে পারি, তাহলে আমার পরিণতি কল্যাণময় হবে এবং আমি আল্লাহর সরল পথে অবস্থান করতে পারব।

আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.) এই মহান খুতবার শুরুতে ইরশাদ করেন: الحمد لله الذي لَهُ الكبرياء...»  আলহামদু লিল্লাহিল্লাজী লাহুল কিবরিয়া... (সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী)।

প্রকৃতপক্ষে, কিবরিয়াই ও মহত্ত্ব শুধুমাত্র আল্লাহরই জন্য নির্দিষ্ট। কিন্তু ইবলিস এক বিভ্রান্তিকর ভ্রান্তিতে নিজেকে এই মর্যাদার অধিকারী মনে করেছিল। অথচ যখন সে আল্লাহর হুজ্জতের সামনে মাথা নত করতে অস্বীকার করল এবং সত্য গ্রহণ করল না, তখন তার সকল আমল বাতিল ও নিষ্ফল হয়ে গেল। এই অস্বীকৃতির ধারা ইবলিস থেকে শুরু হয়ে ইতিহাসে বারবার পুনরাবৃত্তি হয়েছে নজরানবাসী থেকে শুরু করে আরও অনেকে, যারা আহলে বাইতের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নেয়নি।

তাই আমিরুল মুমিনিন (আ.) এই বাণীর মাধ্যমে সতর্ক করে দিয়েছেন: : «فاحذروا عباد الله عدو الله» ফাহজারু ইবাদাল্লাহি আদুয়াল্লাহ (হে আল্লাহর বান্দারা! তোমরা আল্লাহর শত্রু থেকে সাবধান থেকো)।

যেমন করোনাকালে সংক্রামক রোগ থেকে বাঁচতে মানুষকে একে অপর থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছিল, তেমনি **ইবলিসের রোগ”**ও অত্যন্ত ছোঁয়াচে। এই রোগ ইবলিসের নিকটবর্তী হওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় এবং অবশেষে মানুষকে আল্লাহর ওলায়াত ও হুজ্জত গ্রহণ করতে বাধা দেয়। এটি আমাদের সকলের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা যে, আমরা যেন গুনাহ ও ইবলিসের পথের নিকটবর্তী না হই। কারণ হুজ্জতে ইলাহী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার শুরু ঠিক এখান থেকেই হয়। আর ইবলিসের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বান্দাদেরকে ইমামুয যামান (আ.) ও আল্লাহর হুজ্জত থেকে বিচ্ছিন্ন করা।

সারসংক্ষেপ

এই আলোচনায় আমরা পবিত্র আয়াতে মুবাহালা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছি। ইমাম রেজা (আ.)-এর বাণী অনুসারে যা শেখ মুফিদ (রহ.) বর্ণনা করেছেন এটিই আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব ব্যাখ্যায় কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত। এই আয়াত নাজিল হওয়ার দিনকে একটি মহান ঈদ হিসেবে পালন করা উচিত। কারণ এই মহান মুহূর্তে রাসূলুল্লাহ (সা.) এক অভূতপূর্ব ঘোষণার মাধ্যমে আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.)-কে নিজেরই সত্তা বলে পরিচয় দিয়েছিলেন।

এই মহিমা নজরানবাসীদের উপরও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এটি তাদের অনুতাপ ও বিস্ময়ে নিমজ্জিত করেছিল। যদিও তারা শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেনি এবং জিযিয়া দিয়ে চুক্তি করেছিল। কিন্তু এই ঘটনার মূল শিক্ষা হলো আল্লাহর সামনে প্রকৃত বন্দেগি তখনই সম্ভব যখন মানুষ আল্লাহর হুজ্জতের সামনে পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও নত হয়।

মহান আল্লাহ মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং তাঁর ইচ্ছাকে এই বন্দেগি ও ওলায়াত গ্রহণের পথেই নির্ধারণ করেছেন।

যাতে আমরা পূর্ববর্তী অস্বীকারকারীদের মতো আল্লাহর গজব ও শাস্তির সম্মুখীন না হই এবং দৃঢ় ঈমান নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারি, তার একমাত্র পথ হলো আহলে বাইত (আ.)-এর ওলায়াত গ্রহণ করা এবং তাঁদের অভিভাবকত্বের ছায়ায় আশ্রয় নেওয়া।

আমাদের সর্বোচ্চ গৌরব এই যে, ঈদে গাদীর দিনে আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.) যিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পর আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠ আমাদের অভিভাবক ও ওলী হয়েছেন। এই আনন্দই পূর্ববর্তী শিয়াদেরকে গাদীরের রাতগুলো জাগরণের মাধ্যমে উদযাপন করতে উদ্বুদ্ধ করত।

পরিশেষে, আয়াতে মুবাহালায় যে ওলায়াতের সত্যতা প্রকাশিত হয়েছে, তা আমাদেরকে সর্বোচ্চ আশার দিকে নিয়ে যায়। আশা করি, এই পবিত্র দিন ও উৎসবের বরকতে আমাদের পিতা ও মালিক হযরত ইমামুয যামান (আজ.)-এর আবির্ভাবের সকল প্রতিবন্ধকতা দূর হয়ে যাবে। 4356703#

captcha