IQNA

‘আমিনে ইরান’ অনুষ্ঠানে বক্তাদের অভিমত

শহীদ নেতার দৃষ্টিতে নারী ছিলেন মর্যাদাবান ও অগ্রসরমাণ

15:03 - June 10, 2026
সংবাদ: 3479288
ইরানের তৃতীয় “আমিনে ইরান, রেওয়ায়াতে মেহর” (ইরানের বিশ্বস্তজন, মমতার বর্ণনা) শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তারা শহীদ ইরানি নেতার নারী ও পরিবার-সংক্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি এবং কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তারা বলেন, নারীদের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল স্বাধীন, মর্যাদাপূর্ণ ও অগ্রগামী।

ইকনা সংবাদদাতার প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিবার দিবস উপলক্ষে ২০ খোরদাদ (ইরানি তারিখ) রাজধানীর তালারে ভাহদাত-এ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল পারিবারিক শহীদদের স্মরণ করা এবং সেই প্রজ্ঞাবান ও দূরদর্শী শহীদ নেতাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা, যিনি তাঁর সম্মানিত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে শাহাদাতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মাসউদ পেজেশকিয়ান, সাইয়্যেদ আব্বাস সালেহি, জাহরা বেহরুজ আজার-সহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

অনুষ্ঠিস্থলে সাম্প্রতিক দুটি আরোপিত যুদ্ধে পরিবার-সহ শাহাদাতবরণকারী শহীদদের আলোকচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

নারী ও পরিবার সম্পর্কে শহীদ নেতার দৃষ্টিভঙ্গি

অনুষ্ঠানের শুরুতে ইরানের একাদশ সংসদের সাবেক সদস্য ও পরিবারবিষয়ক গবেষক কাসেমপুর শহীদ নেতার পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বক্তব্য দেন।

তিনি বলেন, “আমাদের শহীদ নেতা নববী পরিবারের আদর্শ অনুসরণ করে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে অসৎ শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং পরিবারের সঙ্গেই শাহাদাতবরণ করেছেন। এটি পরিবারের গুরুত্ব ও মর্যাদাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।”

তিনি আরও বলেন, ইসলামি বিপ্লব নারীর ক্ষেত্রে “তৃতীয় নারী মডেল”-এর ধারণা উপস্থাপন করেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি সমাজের প্রতি নারীর সামাজিক দায়িত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে। সাম্প্রতিক একশ দিনে নারীরা মনোবৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক ও জাতীয় ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন, যা শহীদ নেতার দৃষ্টিভঙ্গিরই বাস্তব প্রতিফলন।

কাসেমপুর বলেন, শহীদ নেতা কেবল নারীকে একটি স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে দেখেননি; শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রেও নারীর অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল নারীকে তার পূর্ণ মানবিক বিকাশ ও পরিপূর্ণতার পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীদের উন্নয়নের জন্য ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত কর্মসূচি থাকা আবশ্যক এবং রাষ্ট্রকে এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, “নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রতিযোগিতার ধারণা তিনি প্রত্যাখ্যান করতেন। তাঁর মতে, নারীদের প্রতিভা বিকাশ এবং তাদের মর্যাদা রক্ষা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।”

নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা

কাসেমপুর বলেন, শহীদ নেতা মনে করতেন যে, যে পরিবারে নারীর অধিকার সম্মানিত হয়, সেই পরিবারই সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি নারীর প্রতি অন্যায়-অবিচার দূর করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতেন।

পেজেশকিয়ান: ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করবে না

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সূরা আল-বাকারার ১৫৬ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করেন:

“যারা বিপদে পতিত হলে বলে, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং অবশ্যই তাঁর কাছেই প্রত্যাবর্তনকারী।’”

তিনি বলেন, “গত একশ দিনে ইরানি নারীরা এমন ভূমিকা পালন করেছেন, যা শত্রুদের চোখে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এমন দৃশ্য সৃষ্টি করেছে যা কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক কল্পনাও করতে পারেননি।”

তিনি বলেন, শত্রুরা ভেবেছিল তিন দিনের মধ্যেই ইসলামি বিপ্লবকে উৎখাত করতে পারবে। কিন্তু নারীদের সক্রিয় ও নিরলস অংশগ্রহণ তাদের সব হিসাব-নিকাশ ভণ্ডুল করে দিয়েছে।

জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “শত্রুর প্রধান লক্ষ্য হলো আমাদের জাতীয় ঐক্য ধ্বংস করা। কোনো দেশকে বোমাবর্ষণ করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায় না। ক্ষুদ্র গাজ্জাকে তিন বছরেও আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব হয়নি; ইরানকেও কখনো আত্মসমর্পণ করানো যাবে না এবং আমরা কখনো আত্মসমর্পণ করব না।”

তিনি আরও বলেন, গত দেড় বছর ধরে প্রতি সপ্তাহে শহীদ নেতার সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো, যা সরকারের নীতি ও পরিচালনায় শক্তিশালী সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

নারী নেতৃত্বে শহীদ নেতার আস্থা

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ইরানের নারী ও পরিবারবিষয়ক সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাসুমেহ এবতেকার

তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ নারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে নারীর নেতৃত্বে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ শতাংশ শিক্ষক, চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞ নারী।”

তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, “নারী কর্মকর্তাদের প্রতি শহীদ নেতার আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি পুরুষদের তুলনায় কোনোভাবেই ভিন্ন ছিল না। তিনি নারী নেতৃত্বের প্রতি গভীর আস্থা রাখতেন।”

এবতেকার আরও বলেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও নারীর মর্যাদা রক্ষার বিষয়টি শহীদ নেতার বিশেষ গুরুত্বের বিষয় ছিল। তিনি বারবার নারীর নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন।

“বিশ্বের সবচেয়ে উদারমনা নেতা”

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মারজিয়েহ ভাহিদ দস্তজার্দি বলেন, “আমরা বিশ্বের সবচেয়ে উদারমনা নেতার অধীনে বসবাস করেছি।”

তিনি স্মরণ করেন, নারী মন্ত্রী হওয়ার বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে শহীদ নেতা বলেছিলেন, “শরিয়ত ও ফিকহের দৃষ্টিতে নারী মন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে আমার কোনো আপত্তি নেই।”

দস্তজার্দি আরও জানান, এইডস প্রতিরোধের বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে শহীদ নেতা তাঁকে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং প্রতিরোধমূলক শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর অবস্থান রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান

অনুষ্ঠানে ইরানের ত্রয়োদশ সরকারের নারী ও পরিবারবিষয়ক সাবেক সহকারী আনসিয়েহ খাজআলি বলেন, শহীদ নেতা সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিভিন্ন স্তরে নারীর অংশগ্রহণ ও অবস্থান সংরক্ষণের বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিলেন।

তিনি জানান, এক পর্যায়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সর্বোচ্চ পরিষদের নারী ও পরিবারবিষয়ক বিভাগ বিলুপ্ত করার প্রস্তাব উঠলে তিনি প্রতিবাদ জানান। বিষয়টি শহীদ নেতাকে অবহিত করার পরপরই তাঁর কার্যালয় থেকে জানানো হয় যে বিভাগটি স্বাধীন কাঠামো হিসেবেই বহাল থাকবে।

খাজআলি আরও বলেন, নারীসমাজের বিভিন্ন দাবির প্রতিও শহীদ নেতার সূক্ষ্ম মনোযোগ ছিল। নারীদের জন্য পৃথক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মসূচির বিষয়েও তিনি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।

অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে শহীদ পরিবারের সদস্যদের স্মৃতিচারণ, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং শহীদ শিশুদের স্মরণে বিশেষ নাট্য উপস্থাপনাও অনুষ্ঠিত হয়। 4357406#

captcha