IQNA

0:08 - August 05, 2020
সংবাদ: 2611266
তেহরান (ইকনা): বিবিছি ( বিবিসি ) আবারো করোনা সংক্রান্ত ইরান বিরোধী প্রচার প্রপ্যাগাণ্ডায় লিপ্ত হয়েছে।

বিবিছি ( ফার্সী ) ইরান সরকারের ভিতরের অজ্ঞাতনামা এক সূত্রের প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলছে যে গত ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ জুলাই ২০২০ পর্যন্ত ইরানে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা নাকি ৪২০০০ যা ইরান সরকারের ঘোষিত মৃতের সংখ্যা : ১৪৬৩৪ - এর চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি!! আর ইরানে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের প্রকৃত সংখ্যা নাকি ২৭৮৮২৭ নয় বরং তা হচ্ছে ৪৫১০২৪ জন। বিবিছি ঐ অজ্ঞাত নামা সূত্রের নাম উল্লেখ করে নি যা থেকে প্রমাণিত হয় যে উক্ত সূত্রটি প্রামাণিক ( অথেন্টিক ) নয় বরং তা হচ্ছে এক ভুয়া সোর্স যা অতি সহজেই যত্র তত্র বানানো ও উল্লেখ করা যায় এবং কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তি তাতে আস্থা স্থাপন করতে পারে না।

আর এ ধরনের সোর্সের উল্লেখ করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অনেক কিছু কথা বলা ও দেখানো যায় যার ভুড়ি ভুড়ি নজীরও বাস্তবে রয়েছে। আর গ্রহণযোগ্য করার জন্য বিবিছি শুধু ঐ অজ্ঞাত নামা সূত্রের উদ্ধৃতির উপর নির্ভর করে নি বরং বিবিছি সংবাদের সত্যতা যাচাই এর জন্য তার নিজস্ব মেথড ও পদ্ধতিও নাকি কাজে লাগিয়ে ঐ পরিসংখ্যানের ( ইরানে করোনায় মৃতদের সংখ্যা ৪২০০০) ব্যাপারে নিশ্চিত (?) হয়েছে!! বাহ্ বাহ্ কত সুন্দর কথা!!! তাই এখন আমাদেরকেও (সকল বিশ্ববাসী) বিশ্বাস করতে হবে যে বিবিছি প্রদত্ত ঐ সংবাদটা সত্য ও সঠিক!!! কারণ এখবরটা বিবিছি দিয়েছে এবং তা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজিলকৃত ওহীর (ওয়াহ - ই মুনযাল) মতো পরম ধ্রুব সত্য!!!! অবশ্য এটা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা বিবিছিকে পরম সত্যবাদী ও নির্ভরযোগ্য মনে করে । কিন্তু যারা সংগত ও বস্তু নিষ্ঠ কারণে বিবিছি কে সত্যবাদী ও নির্ভরযোগ্য (বিশ্বস্ত) মনে করে না বরং বিবিছিকে ভণ্ড , ফাসিক (লম্পট , অসৎ , মিথ্যাবাদী দুর্নীতি পরায়ণ) , মিথ্যাচারী বলে জানে ও বিশ্বাস করে তারা " আর যখন কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসবে তখন তা যাচাই-বাছাই (তাবাইয়ুন) করো ; (কারণ যাচাই বাছাই না করে তা গ্রহণ করলে) অজ্ঞতা বশত: তোমরা কোনো কওমকে (সম্প্রদায়) আক্রমণ করে (অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে ভুল পদক্ষেপ নিয়ে) আফসোস ও পরিতাপ করবে (সূরা - ই হুজুরাত : ৬) - পবিত্র কুরআনের এ আয়াতের আলোকে বিবিছির মতো ভণ্ড , ফাসিক , মিথ্যাচারী সংবাদ মাধ্যমের পরিবেশিত খবর ও প্রতিবেদন বিশ্বাস করবে না। আর বিশেষ করে এই সংবাদ মাধ্যম সহ সকল পাশ্চাত্য মিডিয়া ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে ৪১বছরের অধিক কাল ধরে ভয়ঙ্কর ধরণের মিথ্যা অপপ্রচার ও প্রচার যুদ্ধে লিপ্ত। তাই বিবিছি ও এর সতীর্থ সকল পাশ্চাত্য মিডিয়া বিশ্ব বিশেষ করে ইরান সংক্রান্ত সংবাদ ও খবরাখবর পরিবেশনে নিরপেক্ষ তো নয়ই বরং পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের পক্ষাবলম্বন কারী এবং ঐ সকল সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও দেশের স্বার্থ সংরক্ষণকারী এবং তাদের পদক্ষেপ ও নীতিমালার সমর্থক ও প্রবক্তা অর্থাৎ এক কথায় এ সব সংবাদ মাধ্যম হচ্ছে পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের লেজুর ও দোসর। এ কারণে বিবিছি ও এর মতো সংবাদ মাধ্যম গুলো হচ্ছে ইরানের শত্রু , ইরান বিদ্বেষী এবং ইরানের প্রতি শত্রু মনোভাবাপন্ন ও শত্রুতা পোষণকারী এবং এগুলো কস্মিনকালেও নিরপেক্ষ নয়। অতএব বুদ্ধিমান কোনো ব্যক্তি কি এ ধরনের সংবাদ মাধ্যম পরিবেশিত এ ধরনের খবরে আস্থা স্থাপন করতে পারে?!

গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ইরানে করোনা সংক্রমণের খবর প্রকাশিত হলে বিবিছি তখনও ইরানের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছিল এবং যে সব কথা বলেছিল সেগুলো সবই ইরানের চেয়ে বহুগুণ তীব্র ও ভয়ঙ্কর ভাবে ব্রিটেন , ফ্রান্স , ইতালি , স্পেন , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ পাশ্চাত্যের ক্ষেত্রে ফলেছে ও সত্য হয়েছে। অথচ তখন বিবিছির তথাকথিত রিয়েলিটি চেক টিমের চোখে করোনা সংক্রমণ সংক্রান্ত ইরানের অসুবিধা গুলো ধরা পড়লেও নিজেদের ঐ একই অসুবিধাগুলো ধরা পড় নি যা সত্যি বিস্ময়কর ও দু:খজনকও বটে। তাহলে এ থেকে খুব ভালো ভাবে বোঝা যায় যে বিবিছির উক্ত তথাকথিত রিয়েলিটি চেক টিমের আসল মুরোদ ও দৌড় কতটুকু এবং তা কতটুকু নিরপেক্ষ!!! আর এ বারেও ঐ একই বাস্তবতা সমভাবে প্রযোজ্য। কারণ , এই বিবিছির দাবী : ইরান করোনায় মৃতদের সংখ্যা শুধু লুকোয় নি বরং মিথ্যাও বলছে। অর্থাৎ ইরান হচ্ছে মিথ্যুক ও মিথ্যাবাদী। আর এভাবে ইরানের গায়ে মিথ্যুক ও মিথ্যা বাদীর লেবেল এটে বিশ্ববাসীর কাছে ইরানকে ভয়ঙ্কর মিথ্যাবাদী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার কতটা অপচেষ্টা ও অপপ্রয়াস চালিয়েছে বিবিছি! ছি! ছি!। অতএব দেখুন ইরানের বিরুদ্ধে কিরূপ ভয়ঙ্কর অপপ্রচার ও মিথ্যাচার বিবিছির এবং তার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ব্রিটিশ সরকারের।

এটাতো গেল বিবিছির করোনা সংক্রান্ত ইরান বিরোধী অপপ্রচার ও প্রপ্যাগাণ্ডার এক সংক্ষিপ্ত চিত্র।
এখন আসুন দেখুন করোনায় মৃতদের সংখ্যা ব্রিটিশ সরকার শুধু গোপণ করে নি ও কমিয়ে বলে নি বরং এ ব্যাপারে মিথ্যা ও বলেছে। স্বয়ং বিবিছি ( BBC News বাংলা ) ১৩-৫- ২০২০ এর রিপোর্ট:
করোনা ভাইরাস : ব্রিটেনে মৃতের সংখ্যা যা বলা হচ্ছে তার থেকে অনেক বেশি?
ব্রিটেনে কোভিড ১৯ - এ যে পরিসংখ্যান প্রতিদিন সরকারি ব্রিফিং- এ দেয়া হচ্ছে জানা যাচ্ছে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা এর প্রায় দ্বিগুণ। পয়লা মে তারিখ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের স্বাস্থ্য ও সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় মৃতের যে পরিসংখ্যান দিয়েছে তাতে বলা হচ্ছে ওই পর্যন্ত দেশটিতে করোনা ভাইরাসে মারা গেছে ২৮০০০ মানুষ। ((তাহলে পহেলা মে ২০২০ পর্যন্ত করোনায় মৃতের প্রকৃত সংখ্যা হবে প্রায় এর দ্বিগুণ অর্থাৎ ৫৬০০০ মানুষ।))
কিন্তু ওই তারিখ পর্যন্ত সরকারিভাবে নথিভুক্ত মৃতের তালিকায় মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। নথিভুক্তদের মধ্যে ৩৬০০০ এর ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ লেখা হয়েছে কোভিড - ১৯। পরিসংখ্যান বিদরা যে পদ্ধতিতে ওই সময়ে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে পরিসংখ্যান তত্ত্বের হিসাবে আন্দাজ করা হয়েছে, তাতে এই সংখ্যা ৫০০০০ এর বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ........ প্রত্যেকটা গণনা পদ্ধতিই সরকারি সংখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
কিন্তু কই বিবিছি তো ব্রিটেনকে মিথ্যাবাদী বলে অভিহিত করে নি এবং বলেও নি যে করোনায় মৃতের সংখ্যা নিয়ে ব্রিটেন মিথ্যা বলছে বা এর রাজনীতি করণ করছে। বরং " সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্বাসযোগ্য নয় ? " অথবা " প্রত্যেকটা গণনা পদ্ধতিই সরকারি সংখ্যাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। " ------- ব্যস এতটুকু বলেই ক্ষান্ত থাকছে বিবিছি !!!!
সুতরাং সেই মতে সরকারি হিসাবে ব্রিটেনে করোনায় মৃতের সংখ্যা বর্তমানে ৪৬২০১ হলে প্রকৃত সংখ্যা যদি দ্বিগুণ হয় তাহলে ৯২০০০ এর মতো মানুষের মৃত্যু হয়েছে ব্রিটেনে।
২ রা জুন ২০২০ এর ব্রিটেনের গার্ডিয়ান পত্রিকার রিপোর্ট :
সরকারি পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে:
ব্রিটেনে করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ৫০০০০ ছাড়িয়ে গেছে।
আর ব্রিটেন হচ্ছে (করোনায়) সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি।
জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের (ও এন এস) অনুযায়ী ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে করোনায় নিশ্চিত ও সন্দেহযুক্ত মৃতের যে সংখ্যা নিবন্ধন করা হয়েছে তা ২২ মে ২০২০ এর মধ্যেই ৪৪,৪০১ জনে পৌঁছেছে। কিন্তু স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডস্থ এন এইচ এস এবং অন্যান্য পরিসংখ্যান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান গুলো রোগ করা হলে ব্রিটেনে করোনা ভাইরাস সংক্রমণে
মৃতের সংখ্যা দাঁড়াবে ৫০০৩২ জন।
রোগ বিশ্লষণ কারীরা গত এপ্রিলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে আগষ্ট মাসের প্রথম দিকেই ব্রিটেনে করোনায় মৃতের সংখ্যা ৬৬০০০ হতে পারে।
যাহোক বর্তমানে ব্রিটেন করোনায় মৃতের যে পরিসংখ্যান (৪৬২০১ জন) প্রকাশ করেছে তা আসলে বিবিছি এবং দ্য গার্ডিয়ানের রিপোর্ট মোতাবেক কমপক্ষে ৯২০০০ হতে পারে। কিন্তু বিবিছি ও গার্ডিয়ান পত্রিকা ব্রিটেন এবং ব্রিটিশ সরকারকে বলে নি যে করোনা নিয়ে তারা মিথ্যা বলছে অথচ ইরানের বেলায় ব্রিটিশ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দোসর ও স্বার্থ সংরক্ষণকারী বিবিছি বলছে : করোনায় মৃতদের সংখ্যা ও পরিসংখ্যান নিয়ে ইরান মিথ্যা বলছে ও রাজনীতি করছে!!!।
বিবিছি ইরানে সরকারিভাবে ঘোষিত করোনায় মৃতদের সংখ্যার সাথে যারা করোনার লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছে তাদেরকে এবং যারা করোনার লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে অথচ করোনায় মৃত্যু প্রমাণিত হয় নি তাদের সংখ্যাও যোগ করে ৪২০০০ বানিয়েছে। অথচ এ কাজটা ব্রিটেনের করোনা রোগীদের ক্ষেত্রে করেনি। অর্থাৎ ব্রিটেনে করোনায় মৃতদের সরকারি পরিসংখ্যানের সাথে করোনার লক্ষণ নিয়ে যারা হাসপাতালের বাইরে মারা গেছে তাদের সংখ্যা এবং যারা করোনার লক্ষণ নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছিল তাদের সংখ্যা যোগ করেনি যদিও ব্রিটেনের বিভিন্ন পরিসংখ্যান সংস্থা ও কর্তৃপক্ষ এ হিসাবটা করে বলেছে মৃতের প্রকৃত সংখ্যা সরকারিভাবে ঘোষিত মৃতের সংখ্যার দ্বিগুণ অথবা বলেছে যে ১লা মে অথবা ১লা জুনের মধ্য দেশটির করোনায় মৃতের সংখ্যা ৫০০০০ ছাড়িয়ে গেছে।
তাই চাক্ষুষ মান ও বিবেকবান মানুষের উচিত বিবিছির এ ধরণের অপপ্রচার থেকে সতর্ক থাকা।

লেখক: মুহাম্মদ মুনীর হুসাইন খান

নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য:
* captcha: