IQNA

মুহম্মদ মুহসিন;
1:02 - September 23, 2020
সংবাদ: 2611517
তেহরান (ইকনা): চলতে থাকলো ম্যাজিক গাড়ি। চলতে চলতে মনে হলো গাড়িটির আরো একটি ম্যাজিকাল গুণ আছে। এই গাড়ি রাস্তার খানাখন্দের সাথে তাল রেখে যতই লাফালাফি করুক তাতে ভিতরের যাত্রীদের কিচ্ছু আসে যায় না। কারণ যাত্রীদের মাথাগুলো গাড়ির ছাদ দিয়ে এবং শরীরগুলো চতুষ্পার্শ্বের মানুষের চাপ দিয়ে এমনভাবে আটকানো আছে যে তাদের এক সুতাও নড়েচড়ে যাওয়ার কোনো ভয় নাই। এই ম্যাজিকের ভার কিছুক্ষণে অবশ্য কিছুটা কমলো।

কিছু মানুষ পথে পথে নেমে যাওয়ায় চারপাশের চাপ একটু হালকা হলো। এখন মাথাটা ডানে বাঁয়ে একটু কাৎ করাও সম্ভব হচ্ছিলো এবং বাইরের দু’একটি দৃশ্য চোখ পর্যন্ত এসেও পৌঁছেছিলো। সেই সুযোগেই হঠাৎ চোখে পড়লো, ‘তিতুমীর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’লেখা একটি সাইনবোর্ড। বোঝা গেল আমি যেখানে যাবো তার কাছাকাছি এসে গেছি। তাই বলে আমি হাবলুর মতো লাফিয়ে উঠলাম না, কারণ আমি তো মিস্টার বিনের চেয়েও জ্ঞানী এক পরিব্রাজক, আমার পাশে রয়েছেন এক প্রবীণ যাত্রী যিনিও নামবেন রামচন্দ্রপুরে। সুতরাং আমি তো পরিমাণমতো ভাব নিয়ে নির্বিকার বসে থাকতেই পারি এবং সকলকে বোঝাতে পারি যে এই পথে প্যাসেঞ্জারিতে আমি আদমি কাবেল কারো চেয়ে কম নই।

কিন্তু সে বোঝাতে গিয়ে অল্পক্ষণের মধ্যে আমিই প্রয়োজনীয় বুঝ পেয়ে গেলাম। মিনিট কয়েকের মধ্যেই বাজার একটা পার হয়ে আমার ম্যাজিক গাড়ি এগিয়ে চললো। ফাঁকফোকর গলে দোকানের সাইনবোর্ডগুলো যতটুকু চোখে পড়লো তাতে রামচন্দ্রপুর লেখাও যেন দেখলাম বার কয়েক। তা, আসল রামচন্দ্রপুর আসার আগেই এমন সাইনবোর্ড তো অনেকই চোখে পড়তে পারে। আর আসল রামচন্দ্রপুর এখনো আসেনি এই মর্মে পুরোপুরি ইয়াকিন নিয়েই পাশের প্রবীণ বিজ্ঞতর যাত্রীকে জিগ্যেস করলাম- ‘মূল রামচন্দ্রপুর বাজার আরও সামনে, তাই না?’ আমার প্রবীণ ও বিজ্ঞ সহযাত্রী- ‘তা-ই হবে’বলতে যাচ্ছিলেন বলেই মনে হলো। কিন্তু তার আগেই পাশের অন্য যাত্রীরা হুড়ুদ্দুম চেঁচিয়ে উঠলো- ‘আরে মশাই কী বলেন? রামচন্দ্রপুর এই মিনিট কয়েক আগেই ফেলে এলেন তো- না চেনেন পাশের দু’একজনকে বলবেন তো?’ বুঝলাম মিস্টার বিনরা এভাবেই মিস্টার বিন হয়। এমন মহানায়ক অভিনেতার সাথে নিজেরে মিলিয়ে নিতে পারার এই আনন্দ নিয়ে নামলাম ম্যাজিক গাড়ি থেকে।

ম্যাজিক গাড়ি থেকে নেমে ফেলে আসা পথের দিকে অর্থাৎ উল্টোপথে হাঁটা শুরু করলাম। একটা গ্রাম্য জীর্ণ দোকানঘরের সামনে দু’জন মানুষ বসা দেখে তাদের কাছে জানতে চাইলাম-‘তিতুমীরের নারিকেলবাড়িয়া গ্রামটি কোন দিকে?’ তারা প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রথমেই আমার নাম, পরিচয়, ঠিকানা ইত্যাদি জানতে চাইলো। ঠিকানা শুনে প্রথম প্রশ্নই ছিল- আমি পাসপোর্ট ভিসায় এসেছি নাকি চোরাইপথে। নাম পরিচয়ের প্রশ্ন চলাকালীন পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছিল যে, আমি বাংলাদেশেরই কোনো গ্রাম দিয়ে হাঁটছি এবং বাংলাদেশেরই কারো কাছে কোনো গন্তব্যের পথ জানতে চাচ্ছি। কারণ, এ কথা বাংলাদেশের যে-কোনো গ্রামের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য যে, আপনি বাংলাদেশের কোনো গ্রামের পথ দিয়ে হাঁটবেন আর যার সাথে দেখা হবে তার কাছে আপনার ঠিকানা না বলে হেঁটে যাবেন, বা হেঁটে যেতে পারবেন তা তো হবে না। তবে তাদের তৃতীয় প্রশ্নটি বজ্রের প্রচণ্ডতায় জানিয়ে দিলো যে, এটা বাংলাদেশ নয়, কারণ, বাংলাদেশের কোনো গ্রামে কোনো বাঙালি চেহারার মানুষ হাঁটবে আর তার দেশ ভারত বললে তাকে জিগ্যেস করবে যে, সে পাসপোর্ট ভিসায় এসেছে নাকি চোরাই পথে এসেছে- এমনটা কখনো হতে দেখিনি।

যাক, প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পাওয়ার পরে মনে হলো তারা আমার প্রশ্নের ব্যাপারে খেয়াল দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলো। দু’জনের একজনকে মনে হলো একটু শিক্ষিত গেছের। একজনের নাম বললো শের আলি, আরেকজনের নাম আর মনে পড়ছে না। শিক্ষিত জন বললো- ‘আপনি আপনার গন্তব্যে যাওয়ার পথ অনেকখানি পিছনে ফেলে এসেছেন, এইসব টোটো বা ম্যাজিক গাড়ির একটায় উঠে রামচন্দ্রপুর ছেড়ে আরো উল্টোমুখো এগিয়ে হুগলী টালি কারখানা নামক স্থানে নামবেন, সেখানে গেলেই হাতের বাঁ দিকে তিতুমীরের নারিকেলবাড়িয়া যাওয়ার পথ পাবেন।’ পথের এই নির্দেশনা নিয়ে কিছু দূর এগোতেই পিছন থেকে ওনাদের একজন জোরে চেঁচিয়ে জানালো- ‘ভাই, আপনি তিতুমীরের বাড়ি যাবেন- কেন যাবেন হে? সে তো বেঁচে নেই।’ শুনে আমার খটখট করে হাসি পাচ্ছিলো। কিন্তু হাসতে পারিনি। বিদেশ-বিভূঁয়ে কোন হাসির কী মানে হয়ে যায়- আল্লা মালুম। শেষে বিপদের আবার হাত-পা থাকবে না। সুতরাং না হেসেই জানালাম- ‘সে আমি জানি। আমি তার কবর দেখতে যাচ্ছি, তাঁকে নয়।’ আমার উত্তরটিও যে তাদের কথার চেয়ে কম অগা-মার্কা ছিল না সে কথা তখনো আমার খেয়ালে জাগেনি। তখনো আমার মাথায় আসেনি যে তিতুমীরের কোনো কবর নেই।

‘কবর আবার দেখে নাকি? কবর তো জিয়ারত করে।’ তবে আরব দুনিয়ায় মানুষ সবই জেয়ারাত করে। মসজিদে নববী থেকে নেমে আপনি যে দিক দিয়েই বের হন রাস্তায় ট্যাক্সি-ওয়ালাদের-‘জেয়ারা জেয়ারা’ডাক কোনো দিক দিয়েই মিস করবেন না। আর আপনার তখন ভুল করে মনে হতে পারে, মদিনায় মনে হয় কাজই দুটো- মসজিদে নববীতে নামাজ পড়া আর কবর জেয়ারত করা। কিন্তু জেয়ারার গাড়িতে যদি উঠে বসেন তো দেখবেন, না, গাড়িগুলো যেখানে যাচ্ছে সেখানে কবর নেই, আছে ইতিহাস। আমিও কবর দেখবো বলে যেদিকে রওয়ানা হলাম সেখানে মূলত কবর নেই, আছে ইতিহাস। কবর যে নেই সে কথা তখনো আমার মাথায় আসেনি।

(চলবে)...
সূত্র: banglatribune

নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য:
* captcha: