IQNA

1:03 - January 18, 2021
সংবাদ: 2612124
তেহরান (ইকনা): ড. সোহেল আহম্মেদ: এ লেখা যখন লিখছি তখন ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ট্রাম্পের বিদায় নিঃসন্দেহে মুসলমানদের জন্য কিছুটা হলেও স্বস্তির। কারণ ট্রাম্প শুরু থেকেই মুসলিম বিদ্বেষী ছিলেন। ২০১৬ সালে নির্বাচনী প্রচারের সময়ও সরাসরি মুসলিম বিদ্বেষ উসকে দিয়েছেন।
এরপর ক্ষমতায় এসেই সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন মুসলমানেরাই তার প্রধান টার্গেট। গণতন্ত্রে গণশাস্তি দেওয়ার কোনো বিধান নেই। কিন্তু সাত মুসলিম দেশের সব নাগরিকের বিরুদ্ধে এমন শাস্তিরই আদেশ দেন ট্রাম্প। এরপর টানা চার বছর নানা কায়দায় মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। ফিলিস্তিনি ইস্যুতে কোনো ধরণের লোকলজ্জার ধারও ধারেননি তিনি। ইসরাইলি দখলদারিকে একবাক্যে সমর্থন দিয়েছেন। মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান মসজিদুল আকসা অধ্যুষিত জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
 
যাওয়ার আগ মুহূর্তেও মুসলিম বিশ্বের ‌ইসরাইল সংক্রান্ত মৌলিক নীতি ছিন্নভিন্ন করার কাজটি সুচারুভাবে পালনের চেষ্টা করেছেন ট্রাম্প। মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত ও মৌলিক নীতি ছিল অবৈধ ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেবে না তারা। কিন্তু ট্রাম্প নানা কৌশলে এই নীতিতে আঘাত হেনেছেন। সম্প্রতি কয়েকটি মুসলিম দেশ ট্রাম্পের চাপে ঘটা করে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। যারা নিরপরাধ ও নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদেরকে নিজের ঘরবাড়ি থেকে বের করে সেখানে বসতি স্থাপন করেছে এবং নারী ও শিশুসহ অসহায়দের এখনও হত্যা করছে তাদেরকে মেনে নিতে মুসলিম শাসকদের বাধ্য করতে ট্রাম্প রাতদিন খেটেছেন। এ ক্ষেত্রে তার প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করেছেন জামাতা জেরাড কুশনার। ট্রাম্পের এই জামাতা ইহুদি ধর্মাবলম্বী। ইহুদি হওয়াটা বড় কোনো সমস্যা নয়। কুশনারের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো তিনি ইহুদি ধর্মকে পুঁজি করে বিশ্বে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী,তিনি ইহুদিবাদী। নয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের স্ত্রী জিল বাইডেনও ইহুদি ধর্মাবলম্বী। কিন্তু তিনি কুশনারের মতো ইহুদি আধিপত্যবাদে বিশ্বাসী কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়।
 
ইসরাইলকে একচেটিয়া সমর্থন দিতে গিয়ে ট্রাম্প ইরান ইস্যুতে চরম নীতি-অবস্থান অনুসরণ করেছেন। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলকে চলে যেতে বলছে ইসলামি ইরান। তেহরান জোর দিয়ে বলছে অন্যের ভূমিতে থাকার অধিকার ইসরাইলের নেই, এটাকে পুরোপুরি গুটিয়ে ফেলতে হবে। এই অবস্থান ট্রাম্পের কাছে অসহনীয় ছিল। ইরানের এই ন্যায্য অবস্থান ট্রাম্পের পূর্বসূরিরাও সহ্য করতে পারেননি, কিন্তু তারা ট্রাম্পের মতো এতো বেশি নির্লজ্জ ছিলেন না। তারা এর আগে ইরান ও ইসরাইল ইস্যুতে প্রায় একই ধরণের নীতি অনুসরণ করে গেছেন, কিন্তু  তা করেছেন চাতুর্যের সঙ্গে। ট্রাম্প চরম নির্লজ্জ ও বেপরোয়া বলেই ইরানের পরমাণু ইস্যুতে স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে হাসতে হাসতে বের হয়ে যেতে পেরেছিলেন। এটি যে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি, এটি যে আমেরিকার ওপর বিশ্বের আস্থাকে আরও হ্রাস করবে তা একবারও ভাবেননি ট্রাম্প। তিনি গত বছর বিশ্বের এক নম্বর জেনারেল হিসেবে খ্যাত ইরানি সেনা কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করেছেন এর পরিণতির কথা চিন্তা না করেই। হত্যার পর এর দায়ও সরাসরি নিয়েছেন ট্রাম্প।
 
ট্রাম্প অস্থির প্রকৃতির মানুষ। একইসঙ্গে তিনি নির্লজ্জ। ব্যক্তিগত এসব বৈশিষ্ট্য রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও তাকে প্রভাবিত করেছে বারংবার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ দিনের পররাষ্ট্রনীতিই তিনি অনুসরণ করেছেন, কিন্তু নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কখনো কখনো ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের কারণে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন, নির্লজ্জ আচরণ করেছেন। নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নিঃসন্দেহে এমন অস্থিরতা দেখাবেন না। কিন্তু বাইডেন কি মার্কিন মৌলিক নীতির বাইরে যেতে পারবেন? না, বাইডেনও তা পারবেন না। তিনি সবই করবেন, কিন্তু পদ্ধতিতে থাকবে বৈচিত্র্য। তিনি হবেন ট্রাম্প-পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্টদের মতো অনেক বেশি ধূর্ত। তিনি মুসলমানদের ক্ষতি করবেন ঠিকই, কিন্তু তা করবেন কৌশলে। প্রয়োজনে সৃষ্টি করবেন নতুন কোনো জঙ্গি গোষ্ঠী, যা দীর্ঘ মেয়াদে মুসলমানদের শেকড়ে পচন ধরাবে।
 
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মৌলিক নীতি হচ্ছে রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মের কর্তৃত্ব থাকবে না। ধর্ম থাকতে পারে কেবলি ব্যক্তিগত গণ্ডির ভেতরে। তাদের প্রচারণার একটি অংশ হলো ইসলামি রাজনৈতিক দর্শন সেকেলে। বর্তমান যুগের জন্য তা মানানসই নয়। কিন্তু ইরানে ১৯৭৯ সালে বিপ্লব হওয়ার পর ইসলাম ভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও উন্নয়নের যে মডেল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মডেলকে বর্তমান বিশ্বের পুঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার জন্য হুমকি বলে মনে করছে তারা।
 
ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি সই করেছিলেন ওবামা প্রশাসন। সে সময় বাইডেন ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। ইরানের ক্ষিপ্রগতির উত্থানে এর বাইরে কোনো উপায় ছিল না ওবামা প্রশাসনের। ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে অনেক বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন। ইরানের মতো শক্তির সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকিতে চলে গিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এখনও সেই ঝুঁকি কাটেনি। বাস্তবতা হচ্ছে, ইরানের সঙ্গে সামরিক যুদ্ধের ঝুঁকি নেয়ার অবস্থায় এখনও নেই আমেরিকা। যুদ্ধে জড়ানোর মতো আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত এড়িয়ে চলবে বলেই ইরানের পরমাণু চুক্তিতে ফিরে আসতে পারে বাইডেন প্রশাসন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক হিসেব-নিকেশে এখনও ইরানের সঙ্গে সর্বাত্মক যুদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে নয়।  ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পরিণতিতে যে অবৈধ ইসরাইলের নিরাপত্তাও অকল্পনীয় হুমকির মুখে পড়বে তা ভালোকরেই জানে আমেরিকা। সব হিসেব-নিকেশ যখন আমেরিকার অনুকূলে যাবে তখন ইরানে হামলা চালাতে এক মুহূর্তও অপেক্ষা করবে না হোয়াইট হাউজ। 
 
ইরান মার্কিন অভিলাষ ভালো বোঝে। এ কারণে দেশটি নিজের প্রতিরক্ষা শক্তি ক্রমেই জোরদার করছে। বাইডেনের মঞ্চে আগমনের আগ মুহূর্তেও ইরান ক্ষেপণাস্ত্রের যে প্রদর্শনী ও মহড়া দেখাচ্ছে তা মার্কিন নতুন প্রশাসনের জন্য সতর্ক সংকেত। আমেরিকা নিরুপায় হয়ে শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তিতে যদি ফিরে আসে তাহলেও ইসলামি সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ মেয়াদি মার্কিন ষড়যন্ত্র থেমে থাকবে না। সামরিক পন্থা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় বেসামরিক পন্থায় ইরানের ইসলামি ব্যবস্থাকে ধ্বংসের কৌশল ট্রাম্পের সময়ের চেয়ে আরও ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে বাইডেন জমানায়। প্রবল হয়ে উঠতে পারে ইরানের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা সৃষ্টির প্রক্রিয়া। এই কৌশল এর আগে বহু বার বিশেষকরে ওবামার সময় চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। অবশ্য মন্দ কাজে ব্যস্ত থাকতে পারাকেও এক ধরণের সার্থকতা বলে মনে করে এক শ্রেণির দুষ্টু ব্যক্তি ও রাষ্ট্র।
সূত্র: পার্সটুডে
নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য:
* captcha: