IQNA

17:06 - February 22, 2021
সংবাদ: 2612302
তেহরান (ইকনা): ৩রা ইসফান্দ্ ১২৯৯ ফার্সী  মোতাবেক একুশে ফেব্রুয়ারির ১৯২১ সালে  ব্রিটেনের পরিকল্পনা প্রণয়নে ও সহায়তায় কাযাখ ব্রিগেড প্রধান রেজা খান মীর্ পাঞ্জ্ এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ইরানের  প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে । 
তখন ইরানের শাহ ছিলেন আহমেদ শাহ কাজার যিনি সাংবিধানিক বিপ্লবের পর বিপ্লবীদের হাতে তদানীন্তন  ইরানের শাহ মোহাম্মদ আলী শাহ ( আহমদ শাহের পিতা ) পদ চ্যুত হলে  ১৯০৯ সালে মাত্র ১১ - ১২ বছর বয়সে ইরানের সাংবিধানিক শাহ নিযুক্ত হন এবং ইরানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব পার্লামেন্ট এবং পার্লামেন্টের নিযুক্ত প্রধানমন্ত্রীর উপর ন্যস্ত হয় । কিন্তু ১৯১৯ সালের ৯ অগাস্ট ( ১৭ মোর্দাদ ১২৯৮ ) ইরান ও ব্রিটেনের মাঝে ইরানের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ভোসূকুদ্দৌলা ও ব্রিটেনের প্রতিনিধি স্যার পার্সী কোক্সের স্বাক্ষরে  একটি গোপন চুক্তি সম্পাদিত হয় । 
 
ঐ চুক্তি মোতাবেক ইরানের সকল রাষ্ট্রীয় ( সামরিক ও বেসামরিক ) বিষয় ব্রিটিশ উপদেষ্টাদের তত্ত্বাবধানে ও তদারকিতে পরিচালিত হতে থাকে এবং কার্যত: ইরান ব্রিটেনের একটি প্রোটেক্টোরেট বা আশ্রিত রাজ্যে পরিণত হয় এবং ইরানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন ও হুমকির সম্মুখীন হয় । তবে এই গোপন চুক্তি ফাঁস হয়ে গেলে সমগ্র ইরানের আপামর জনগণ প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়লে এক পর্যায়ে ভুসূকুদ্দৌলা সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয় এবং ইরানের শাহ আহমদ শাহ কাজারও এ চুক্তি স্বাক্ষর করে চূড়ান্ত করতে অস্বীকৃতি জানালে কার্যত : চুক্তিটি বাতিল হয়ে যায় । আর ঠিক তখন থেকেই ব্রিটেন দেড়শ বছর ধরে ইরান শাসন কারী কাজার রাজবংশের পতন ঘটিয়ে এমন এক নতুন রাজবংশ ক্ষমতায় বসানোর ষড়যন্ত্র  আটতে থাকে যা ইরানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ সংরক্ষণ করবে । তাই ব্রিটেন সেই ধারাবাহিকতায় ১৯২১ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মোতাবেক ৩রা ইসফান্দ ১২৯৯ জেনারেল আয়রন সাইডের তত্ত্বাবধানে ইরানের কাযাক ব্রিগেড প্রধান রেজা খান মীর পাঞ্জ্কে দিয়ে এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ইরান সরকারের ক্ষমতা তার হাতে ন্যস্ত করে । ইরান পার্লামেন্টও এ অভ্যুত্থানের ফলে কার্যত কর্তৃত্ব হারায় ও অকেজো হয়ে পড়ে । 
 
এর ফলে ইরানে ক্ষমতাসীন কাজার রাজবংশ যা ১৯০৯ সালে সাংবিধানিক বিপ্লবের পর এক সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে পরিণত হয়েছিল তদস্থলে ইরানে ব্রিটিশ স্বার্থ সংরক্ষণকারী এক নতুন রাজবংশ ক্ষমতায় বসানোর সকল পূর্ব প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ সম্পন্ন হলে ১৯২৫ সালে ব্রিটেনের সমর্থন ও সহযোগিতায় ১৯২১ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ক্যুদেতা নায়ক সার্দার -ই সেপাহ ( সেনাপ্রধান ) ও প্রধানমন্ত্রী রেযা খান মীর্ পাঞ্জ্ নিজেকে শাহ্ ঘোষণা এবং ব্রিটেনের প্রস্তাবে নিজ বংশীয় নাম পরিবর্তন করে রেযা শাহ্ পাহলাভী নাম ধারণ করে ইরানে পাহলাভী রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করে যা ১৯৭৯ সালের ১১ফেব্রুয়ারী ইসলামী বিপ্লবের বিজয় পর্যন্ত দীর্ঘ ৫৪ বছর ইরান শাসন করে । 
  
 
এ দীর্ঘ ৫৪ বছর প্রথমে ব্রিটেন একচেটিয়া ভাবে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত এবং ১৯৫৩ সালের ১৮ আগস্ট ( ২৮ মোর্দাদ ১৩৩২ ) ক্যুদেতায় প্রধানমন্ত্রী ড: মোসাদ্দেকের নির্বাচিত সরকারের পতন ঘটিয়ে রেজা খান মীর পাঞ্জ্ পাহলাভীর পুত্র মোহাম্মদ রেজা শাহকে ক্ষমতায় পুনর্বহাল করে ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইরানের তেল সম্পদ ( পেট্রোলিয়াম ) হরিলুট করে ।
    
 
স্মর্তব্য যে , দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪১ সালের ২৫  অগাস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , ব্রিটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সেনা অভিযান চালিয়ে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় যৌথভাবে ইরান দখল করে নেয় এবং ব্রিটেন ইরানের তদানীন্তন শাহ  রেজা খান মীর পাঞ্জ পাহলাভীকে ক্ষমতাচ্যুত করে  তদস্থলে তার পুত্র মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীকে ইরানের শাসন ক্ষমতায় বসায় । ইংরেজদের প্রসিদ্ধ বুলি : " আমরাই রেজা শাহ পাহলভীকে ক্ষমতায় বসিয়েছি এবং আমরাই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছি । " আর ইরানের তেল সম্পদ যথেচ্ছা ব্যবহার করেই ব্রিটেন  জার্মানিকে পরাজিত করে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয় লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল ।  
    
 
অতএব নিঃসন্দেহে বলা যায় যে গণতন্ত্রের সূতিকাগার হওয়ার দাবিদার ব্রিটেন এবং বিশ্বে লিবারেল ডেমোক্রেসির প্রবক্তা ও ধ্বজাধারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দু দু'বার ( প্রথমে ১৯২১ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি এবং দ্বিতীয়বার ১৯৫৩ সালের ১৮ আগস্ট ) সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ইরানের মাটিতে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল এবং দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে পাশ্চাত্যপন্থী বিশেষ করে ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাবেদার ও ধামাধরা স্বৈরাচারী পাহলাভী রাজতন্ত্রের কুশাসনে সে দেশের ( ইরানের ) জনগণকে ভয়ানক ভাবে নিষ্পেষিত , জর্জরিত ও ভুক্তভোগী হতে হয়েছিল । 
 
আর এই ন্যাক্কারজনক কাজ অর্থাৎ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে পাশ্চাত্য বিশেষ করে ব্রিটেন , ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ , পাকিস্তান , থাইল্যান্ড , তুরস্ক , ইন্দোনেশিয়া , আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বারবার গণতান্ত্রিক ও জাতীয় সরকারের পতন ঘটিয়ে একনায়ক স্বৈরাচারী সামরিক সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে এবং এভাবে পাশ্চাত্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নিজেদের অবৈধ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ সংরক্ষণ করেছে  এসব ধামাধরা তল্পিবাহক সরকারসমূহকে সেদেশে সমূহে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখে । ঠিক এটাই হচ্ছে গণতন্ত্র প্রেমিক নয়া পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের প্রকৃত স্বরূপ ও চেহারা যা বিশ্ববাসীর চেনা প্রয়োজন ।
 
 
হুজ্জাতুল ইসলাম মুহাম্মদ মুনীর হুসাইন খান

 

নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য:
* captcha: