IQNA

11:38 - March 18, 2022
সংবাদ: 3471575
তেহরান (ইকনা): উপস্থিত সকল ভাই ও বন্ধুদেরকে, সকল শিয়া মু’মিন মোমেনা এবং আহলে বাইতের (আ.) প্রেমিকদেরকে যুগের ইমাম তথা ইমাম মাহদীর (আ.) পবিত্র জন্মবার্ষিকীর উপলক্ষে শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জ্ঞাপন করছি।

মহান আল্লাহর নামে ও তাঁর অলি ইমাম মাহদীর (আ.) স্মরণে শুরু করছি

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِینَ، وَ صَلَّى اللَّهُ عَلَى مُحَمَّدٍ وَ آلِهِ الطَّاهِرِين سیَّما مولانا بقیة اللهِ فی الارضین، وَ لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَی أَعْدائِهِمْ أَجْمَعِینَ

اَللّهُمَّ كُنْ لِوَلِيِّكَ الْحُجَّةِ بْنِ الْحَسَنِ صَلَواتُكَ عَلَيْهِ وَعَلي آبائِهِ في هذِهِ السّاعَةِ وَفي كُلِّ ساعَةٍ وَلِيّاً وَحافِظاً وَقائِداً وَناصِراً وَدَليلاً وَعَيْناً حَتّي تُسْكِنَهُ أَرْضَكَ طَوْعاً وَتُمَتِّعَهُ فيها طَويلا

 

হে আল্লাহ! হুজ্জাত ইবনুল হাসান (আ.) তাঁর উপর এবং তাঁর পূর্বপুরুষদের উপর দরুদ বর্ষিত হোক, এই মুহূর্তে এবং সবসময়। আপনি হোন অভিভাবক এবং সুরক্ষাকারী এবং নেতৃত্ব প্রদানকারী। সাহায্যকারী, পথনির্দেশকারী এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানকারী। যাতে আপনি আপনার জমিনকে তাঁর আদেশে পরিচালনা করেন এবং সেখানে তাঁকে আপনার নেয়ামত দান করেন দীর্ঘকাল ধরে।  

উপস্থিত সকল ভাই ও বন্ধুদেরকে, সকল শিয়া মু’মিন মোমেনা এবং আহলে বাইতের (আ.) প্রেমিকদেরকে যুগের ইমাম তথা ইমাম মাহদীর (আ.) পবিত্র জন্মবার্ষিকীর উপলক্ষে শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জ্ঞাপন করে, আপনারদের সামনে ইমাম মাহদীর মারেফাতের উপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা পেশ করছি:

১। শিয়া-সুন্নি এবং সকল মাজহাবের বিশ্বাসীরা যে প্রসিদ্ধ হাদিসটি মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) থেকে তাদের গ্রন্থসমূহে বারংবার বর্ণনা করেছেন তা হল:

 

مَنْ ماتَ وَ لَمْ یعْرِفْ إمامَ زَمانِهِ مَاتَ مِیتَةً جَاهِلِیة

যে ব্যক্তি তার যুগের ইমামকে না চিনে মৃত্যুবরণ করবে, সে জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল।

অর্থাৎ যে ব্যক্তি মারা গেল, যে মুসলমান মারা গেল, সে নামায পড়ত, রোযা রাখত, হজ পালন করত, ধার্মিক ছিল, তাকওয়াবান ছিল কিন্তু তার যুগের ইমামকে না চিনে মারাগেছে তারা জাহেল তথা কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইমাম মুসা কাজিমের (আ.) সময়ে জীবন-যাপন করেছে কিন্তু ইমাম কাজিমের (আ.) ইমামতে বিশ্বাসী ছিলনা, ইমাম জাফর সাদিকের (আ.) যুগে বসবাস করেছে কিন্তু ইমাম সাদিকের ইমামতে বিশ্বাসী ছিলনা, আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলীর (আ.) যুগে বসবাস করেছে কিন্তু তার ইমামতে বিশ্বাসী ছিলনা, অথবা যারা বর্তমান যুগে বাস করছে কিন্তু ইমাম হাসান আসকারীর (আ.) সন্তান ইমাম মাহদীর (আ.) মারেফাত রাখেনা, রাসূলের (সা.) ভাষায় তারা: مَاتَ مِیتَةً جَاهِلِیة জাহেলিয়াতের তথা কাফের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে। জাহেলিয়াত কোন যুগকে বলা হয়? যে যুগের মানুষের ইমাম ছিল না এবং কোন মুসলমান ছিল না। অর্থাৎ যদিও তারা নামায পড়ে থাকুক না কেন, কবরে তাদেরকে মুসলমান হিসাব করা হবেনা। যদিও তারা কোরআনে বিশ্বাসী হয়ে থাকুক না কেন, বারযাখে এবং কিয়ামতের দিন তাদেরকে ইসলাম ও কোরআনে বিশ্বাসী বলা হবে না। সুতরাং তাওহীদের উপর বিশ্বাস তখনই আমাদের কাজে লাগবে, যখন তা যুগের ইমাম তথা ইমাম মাহদীর (আ.) মারফাতের সাথে হবে। কোরআনে বিশ্বাস এবং ইসলামের অনুসরণ তখনই মানুষের কাজে আসবে, যখন তার সাথে ইমাম মাহদীর মারেফাত ও বিশ্বাস থাকবে।

এই বিষয়টি ইমাম রেজা (আ.) তাঁর ঐতিহাসিক মারভ সফরে নিশাপুর নামক স্থানে হাদিসে সিলসিলাতুয যাহাব যা তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদেরকে থেকে তাঁরা রাসূল (সা.) থেকে এবং তিনি মহান আল্লাহর তরফ থেকে বর্ণনা করেছেন: অর্থাৎ এটা হচ্ছে হাদিসে কুদসি। যেহেতু হাদিসটি মহান আল্লাহ থেকে মাসূমগণ বর্ণনা করেছেন, তাই এটাকে হাদিসে সিলসিলাতুয যাহাব বলা হয়েছে।

 

کلمه لا إلهَ إلَّا اللهُ حِصْني، فمَن دخَلَ حِصْني؛ أَمِنَ مِن عذابي

“কালিমা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” হচ্ছে আমার দূর্গ, যে এই দুর্গে প্রবেশ করবে, সে আমার আযাব থেকে মুক্তি তথা পরিত্রাণ পাবে। সুতরাং যারা কালিমা শাহাদাত পাঠ করবে তারা আল্লাহর আশ্রয়ে থাকবে এবং আযাব থেকে মুক্তি পাবে। তবে ইমাম রেজা (আ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন: 

قَالَ فَلَمَّا مَرَّتِ الرَّاحِلَةُ نَادَانَا بِشُرُوطِهَا وَ أَنَا مِنْ شُرُوطِهَا

 

তবে এর অনেক শর্ত রয়েছে। আর আমি হচ্ছে এর একটি শর্ত। সুতরাং শুধু “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেই মুক্তি পাওয়া যাবে না। তার সাথে অবশ্যই ইমামতে বিশ্বাস রাখতে হবে। আর এ জন্য। ইমাম রেজা (আ.) বলেছেন: কালিমা “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” (لا إِلهَ إِلَّا اللَّهُ) তখনই তোমাকে মুক্তি দিতে পারবে এবং কবর, বারযাখ এবয় কিয়ামতে তোমাকে একত্ববাদে বিশ্বাসী বলে পরিচয় দেয়া হবে, যখন তুমি আমার ইমামতে বিশ্বাস রাখবে এবং যুগের ইমামের আনুগত্য করবে।

ইমাম মাহদীর (আ.) মারেফাত

যুগের ইমাম কে? এবং যুগের ইমামের মারেফাত কি?

আজ এই মহিমান্বিত রাতে আমরা যদি যুগের ইমাম সম্পর্কে কিছু বলতে পারি এবং আমাদের সবার মারেফাত যদি তাঁর সম্পর্কে বৃদ্ধি পায়, তাহলে আমরা আমাদের সব থেকে বড় দায়িত্বটি পালন করতে পেরেছি এবং আমাদের সৌভাগ্যের সব থেকে বড় অবলম্বন জোগাড় করতে সক্ষম হয়েছি।

ইমাম মাহদী (আ.) এমন একজন প্রতিশ্রুত ব্যক্তি, যার সম্পর্কে শুধু কোরআন নয়, বরং কোরআনের পূর্বের সকল আসমানি গ্রন্থে যেমন: তাওরাত, ইঞ্জিল, যাবুর, আবেস্তাসহ সকল ঐশী ধর্মে ইমাম মাহদী (আ.) সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের সুসংবাদ পবিত্র কোরআনের পূর্বেরও সকল আসমানী গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। যদিও ঐ সকল গ্রন্থসমূহ বিকৃত হয়ে গেছে, তারপরও আমরা এখনও ওই সকল গ্রন্থে ইমাম মাহদীর আগমনের সুসংবাদ পাই এবং তারাও আমাদের মত একজন ঐশী মুক্তিদাতা তথা ত্রাণকর্তায় বিশ্বাস করেন। শুধুমাত্র নামের ক্ষেত্রেই পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়, নতুবা তারাও সকলেই ত্রাণকর্তায় বিশ্বাসী এবং তার অপেক্ষায় রয়েছে।

২। পবিত্র কোরআনে খুমস সম্পর্কে একবার বলা হলেও হজ সম্পর্কে ৩ বার বলা হয়েছে। রোযা সম্পর্কে কয়েকবার বলা হয়েছে। আহলে সুন্নতের বর্ণনা অনুযায়ী ইমাম মাহদীর (আ.) আবির্ভাবের ব্যাপারে শতাধিক আয়াত রয়েছে। আর শিয়াদের বর্ণনা অনুযায়ী পবিত্র কোরআনে ইমাম মাহদীর (আ.) সম্পর্কিত আয়াতের সংখ্যা ৩০০টিরও বেশী। আমরা এই আয়াতসমূহকে কিভাবে পাব? হাদিসের সাহায্যে, কোরআনের মুফাসসির ও শিক্ষকদের মাধ্যমে, তাদের নির্দেশনায় এই আয়াতসমূহ খুঁজে পাব। শিয়া-সুন্নি উভয় মাজহাবের আলেমগণ এসম্পর্কিত বহু গ্রন্থ লিখেছেন।

৩। রাসূল (সা.) থেকে বর্ণিত, ইমাম মাহদীর (আ.) আবির্ভাব সম্পর্কিত হাদিসের সংখ্যা এতই বেশী যে, আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলীর (আ.) পর সব থেকে বেশী হাদিস ইমাম মাহদীর (আ.) ব্যাপারে রয়েছে। মাসূমগণ থেকে বর্ণিত ইমাম মাহদী (আ.) সম্পর্কিত হাদিসের সংখ্যা হচ্ছে দুই হাজারের অধিক। সুতরাং ইমাম মাহদী (আ.) সম্পর্কিত রেওয়ায়েত হচ্ছে মুতাওয়াতির হাদিস। ইমাম মাহদী (আ.) সম্পর্কিত রেওয়ায়েত হল, নির্ভরযোগ্য এবং বস্তুনিষ্ঠ। ইমাম মাহদী (আ.) সম্পর্কিত রেওয়ায়েত অনস্বীকার্য। এসম্পর্কে আহলে সুন্নতের স্বনামধন্য আলেম সুয়ূতী তার গ্রন্থে রাসূল (সা.) থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন:

مَنْ اَنْکَرَ ظُهورالْمَهْدِی فَقَدْ کَفَرَ

যে ব্যক্তি ইমাম মাহদীর (আ.) আবির্ভাবকে অস্বীকার করবে সে কাফের।

সুতরাং সম্মানিত ভাই ও বোনেরা! আমরা এপর্যায়ে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, ইমামতের বিষয়ে আমাদের সাথে আহলে সুন্নতের মতপার্থক্য থাকলেও ইমাম মাহদীর (আ.) আবির্ভাবের ব্যাপারে আমাদের সাথে তাদের কোন মতভেদ নেই। আমরাও মাহদাভিয়াতে বিশ্বাস করি তারাও মাহদাভিয়াতে বিশ্বাস করে। আমরাও ইমাম মাহদীর (আ.) আবির্ভাবের অপেক্ষায় আছি, আহলে সুন্নতরাও ইমাম মাহদীর (আ.) আবির্ভাবের অপেক্ষায় আছে। এমনকি আহলে সুন্নতের আলেমগণ ইমাম মাহদীর (আ.) আবির্ভাবকে প্রমাণ করার জন্য ২০০টির বেশী গ্রন্থ লিখেছেন। আহলে সুন্নতের এমন কোন বড় ও মূল্যবান গ্রন্থ নেই, যেখানে ইমাম মাহদীর সম্পর্কিত হাদিস পাওয়া যাবে না। সুতরাং ইমাম মাহদীর প্রতি বিশ্বাস হচ্ছে একটি ধর্মীয় বিশ্বাস, কোরআনি বিশ্বাস, নবুয়্যতি বিশ্বাস। মোটকথা ইমাম মাহদীর প্রতি বিশ্বাস এমন একটি ইসলামী বিশ্বাস যার উপর বিশ্বাস স্থাপন করা সকল মুসলমানের উপর ফরজ এবং অপরিহার্য।

ইমাম মাহদীর (আ.) মারেফাত

 

তবে যুগের ইমাম কে?

আহলে সুন্নতের রেওয়ায়েত অনুসারে ইমাম মাহদীকে (আ.) বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পূর্ববর্তী নবীদের সাথে তুলনা করা হয়েছে এবং ইমাম মাহদীর (আ.) বৈশিষ্ট্যকে পূর্ববর্তী নবীদের অনুরূপ তথা সদৃশ উল্লেখ করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ নিম্নে কিছু দৃষ্টান্ত তুলেধরা হল:

প্রথম সাদৃশ্য

ইমাম মাহদীর (আ.) নামের সাথে মহানবীর (সা.) নামের মিল রয়েছে। মহানবীর নাম কি? হযরত মুহাম্মাদ (সা.)। ইমাম মাহদীর নামও মুহাম্মাদ। সুতরাং আমরা যে সকল নাম যেমন: বাকিয়াতুল্লাহ, সাহেবুয যামান, সাহেবুল আমর, সব থেকে প্রসিদ্ধ হচ্ছে “মাহদী” ইত্যাদি নামে তাঁকে ডাকি, এগুলোর সবই হচ্ছে তাঁর উপাধি। ইমাম মাহদীর নাম হচ্ছে রাসূলুল্লাহর নামের অনুরূপ। যেহেতু হাদিসে বলা হয়েছে গাইবাতের যুগে তাঁকে নামধরে না ডাকতে, তাই আমরা তাঁকে স্মরণ করার সময় তাঁর উপাধি ব্যবহার করি। যুগের ইমামের অনেক উপাধি রয়েছে যার মধ্যে অনেকগুলো উপাধি আমরা ব্যবহার করে থাকি। কিছু উপাধি হচ্ছে কোরআনের উপাধি। যেমন: বাকিয়াতুল্লাহ। যার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর গচ্ছিত সম্পদ। এটা হচ্ছে কোরআনের উপাধি: بَقِيَّةُ اللَّهِ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ তবে ইমাম মাহদীর সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ উপাধি হচ্ছে মাহদী। যারা নিজেদের সন্তানদের জন্য এই সুন্দর নামটি নির্বাচন করেছেন বা করবেন, তারা যেন কোন প্রকার ব্যঙ্গ না করে সঠিকভাবে নামটির উচ্চারণ করেন। কেননা এর অর্থ হচ্ছে, মহান আল্লাহ যাকে হেদায়াত করেছেন।

দ্বিতীয় সাদৃশ্য

বিভিন্ন রেওয়ায়েতে ইমাম মাহদীর (আ.) জন্মকে হযরত ইব্রাহীম (আ.) এবং হযরত মুসা (আ.)-এর জন্মের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কেননা ফিরাউন এবং নমরুদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তাদের জন্ম আল্লাহর নির্দেশে গোপনে হয়েছিল। নমরুদ এবং ফিরাউন স্বপ্ন দেখেছিল যে, এমন মহামানবের জন্ম হবে যিনি তাদের তাগুতি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করবেন। এজন্য এই সকল স্বৈর শাসকরা সকল নবজাতকদেরকে হত্যা করত। আর এজন্যই তাদের জন্ম গোপনে হয়েছিল। অনুরূপভাবে অত্যাচারী আব্বাসীয় শাসকরা বিশেষকরে মো’তামেদ আব্বাসী জানত যে, ইমাম হাসান আসকারীর (আ.) ঔরস থেকে ইমাম মাহদীর (আ.) জন্ম হবে এবং তিনি তাদের তাগুতি শাসনব্যবস্থাকে ধ্বংস করবেন। সেজন্য ইমাম মাহদীর (আ.) জন্মও অতি গোপনে হয়েছিল। একরাতে ইমাম হাসান আসকারীর (আ.) ফুপু হাকিমা খাতুন ইমাম আসকারীর (আ.) বাসায় ছিলেন এবং যখন চলে যাবেন, তখন ইমাম বললেন: ফুপি আজ রাতে আমাদের বাসায় ইফতার করবেন এবং আমার সন্তান আল্লাহর হুজ্জাতের জন্ম হবে, আপনাকে সাহায্য করতে হবে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন কার সন্তান হবে, ইমাম বললেন: নারজিস খাতুনের। তিনি দৌড়ে নারজিস খাতুনের ঘরে গেলেন এবং ফিরে এসে বললেন: আমি তো তাঁর মধ্যে গর্ভবতী হওয়ারও কোন আলামত দেখছি না, সে কিভাবে সন্তান জন্ম দেবে! ইমাম বললেন: তার জন্ম খুব গোপনে হবে সে জন্যই কিছু বোঝা যাচ্ছে না। এটা আল্লাহর বিশেষ কুদরত এবং রহমত। আর এ জন্যই তার মধ্যে গর্ভবতী হওয়ার কোন আলামত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। ইমাম মাহদী (আ.) ২৫৫ হিজরির ১৫ই শাবান, শুক্রবার ভোরবেলা জন্ম গ্রহণ করেন। আমরা আজ তাঁর সেই পবিত্র জন্মদিন উপলক্ষে মাহফিল এবং আনন্দ অনুষ্ঠান পালন করছি। আশাকরি মহান আল্লাহ আমাদের এই মোবারকবাদ এবং শুভেচ্ছাকে এই মুহূর্তে ইমাম আসকারী (আ.) ও নারজিস খাতুনের কাছে পৌঁছে দিবেন, ইনশাআল্লাহ। 

তৃতীয় সাদৃশ্য

ইমাম মাহদীর (আ.) ইমামত হযরত ইয়াহিয়া (আ.) এবং হযরত ঈসার (আ.) মত শিশুকালেই শুরু হয়েছিল। পবিত্র কোরআনে হযরত ইয়াহিয়া (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে: 

يا يَحْيى‌ خُذِ الْكِتابَ بِقُوَّةٍ وَ آتَيْناهُ الْحُكْمَ صَبِيًّا

(আল্লাহ বললেন,) ‘হে ইয়াহইয়া! এ গ্রন্থ (তাওরাত) দৃঢ়ভাবে ধারণ কর।’ এবং আমরা তাকে শৈশবেই প্রজ্ঞা (নবুয়্যত) দান করেছিলাম। 

মহান আল্লাহ ৯ বছর বয়সেই হযরত ইয়াহিয়াকে নবুয়্যত দান করেছিলেন। হযরত ঈসা (আ.) যখন মায়ের কোলের শিশু ছিলেন, তখন আল্লাহ তাকে নবুয়্যত দান করেছিলেন। তিনি ইহুদীদের সামনে নিজের মায়ের সমর্থন করে বলেছিলেন:

قالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتانِيَ الْكِتابَ وَ جَعَلَنِي نَبِيًّا

(শিশু) বললেন, ‘নিশ্চয় আমি আল্লাহর বান্দা, তিনি আমাকে গ্রন্থ দান করেছেন এবং আমাকে নবী করেছেন।

তিনি এটাও বুঝিয়ে দিলেন যে, হে খ্রিস্টানগণ! তোমরা জেনে রাখ আমি আল্লাহ নই এবং আল্লাহর পুত্রও নই। বরং আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং নবী বানিয়েছেন।

২৬০ হিজরিতে ইমাম হাসান আসকারী (আ.) যখন শাহাদাত বরণ করেন তখন ইমাম মাহদীর (আ.) বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর। এই মহান ব্যক্তিদের ইমামতের নিদর্শন হচ্ছে তাঁরা শৈশবেই ঐশী জ্ঞানের অধিকারী হন। তাদের পূর্ণতা অর্জন করা নয় বরং আল্লাহ তাদেরকে এই সকল জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও পূর্ণতা দিয়েই পাঠিয়েছেন। আর একারণেই তাদেরকে কিছু শিখতে বা অর্জন করতে কোন বয়সের প্রয়োজন হয় না। মহান আল্লাহ শৈশবেই তাদেরকে সকল পূর্ণতা ও জ্ঞান দান করে থাকেন। আর তাঁরা সর্বদাই ইমামতের সকল গুণের অধিকারী।

চতুর্থ সাদৃশ্য

ইমাম মাহদী (আ.) তাঁর ইমামতের শুরুতেই গাইবাত তথা অদৃশ্যে চলে যান এবং তাঁর আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত তিনি অন্তর্ধানেই থাকবেন। ইমাম মাহদীর (আ.) গাইবাত দুই প্রকার: (১) গাইবাতে সোগরা বা স্বল্পমেয়াদী অন্তর্ধান। এসময়ে শিয়ারা ইমাম মাহদীর নায়েব তথা প্রতিনিধির মাধ্যমে ইমামের সাথে যোগাযোগ করতে পারত। তারা প্রতিনিধির মাধ্যমে ইমামের কাছে প্রশ্ন করত, ইমাম আবার সেভাবেই তাদের জবাব দিতেন। (২) গাইবাতে কোবরা বা দীর্ঘ মেয়াদী অন্তর্ধান। এটাই হচ্ছে প্রকৃত গাইবাতের যুগ আর আমরা সেই যুগেই বসবাস করছি। এখন আর কোন প্রতিনিধি নেই যিনি আমাদের চিঠি এবং অন্যান্য বিষয়কে ইমামের কাছে পৌঁছে দিবে। যেই দাবি করবে যে, আমি ইমাম মাহদীর (আ.) সাথে সাক্ষাত করতে যাচ্ছি, তোমার চিঠি থাকলে দাও, আমি তাঁর কাছ থেকে জবাব লিখে আনব, সে মিথ্যাবাদী। কেননা গাইবাতে কোবরার যুগে যে সর্বদা ইমাম মাহদীর (আ.) সাথে যোগাযোগ রাখতে পারবে, এমন কোন বিশেষ প্রতিনিধি ইমামের নেই। তবে হ্যাঁ, এমন কিছু বিশেষ ব্যক্তি আছেন যারা আল্লাহর ইচ্ছায় এবং নিজের অজান্তে ইমাম মাহদীর (আ.) সাক্ষাৎ লাভ করে থাকেন। তবে এমনটি নয় যে, তিনি জানবেন যে কখন সাক্ষাতে যাবেন এবং জনগণের কাছ থেকে চিঠিপত্র নিয়ে যাবেন এবং জনগণ ও ইমামের সাথে সেতু বন্ধন তথা মধ্যস্থ হিসাবে কাজ করবেন।

ইমাম মাহদীর (আ.) মারেফাত

ইমাম মাহদীর (আ.) গাইবাত বলতে কি বোঝানো হয়েছে?

ইমাম মাহদী (আ.) কি আসমানে আছেন? না, তিনি পৃথিবীতেই আছেন। ইমাম মাহদী (আ.)কি অদৃশ্য? না, কেননা বহু আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব তাঁর সাথে সাক্ষাত করেছেন এবং করছেন। অনেকে তাঁকে চিনতে পেরেছেন অনেক আবার চিনতে পারে নি। সুতরাং তিনি অদৃশ্য হলে দেখা যেত না। তিনি কি নুর এবং তাঁকে দেখতে গেলেই কি তিনি অদৃশ্য হয়ে যান? না, এমনটি নয়। তিনি তাঁর পূর্বপুরুষদের মতই স্বশরীরে আছেন এবং এই পৃথিবীতেই জীবন-যাপন করছেন। তিনি কি কোন কুয়ার মধ্যে বা পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে আছেন এবং আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত সেখান থেকে বের হবেন না? না, এমনটি নয়। কে বলেছে যে, তিনি কোন কুয়ার মধ্যে বা পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে আছে? ইমাম মাহদী (আ.) আমাদের মতই নিজের বাড়িতে বসবাস করেন। তবে তাঁর বাড়ি কোথায়? সেটা আমরা জানি না। তিনি কি স্ত্রী সন্তানসহ বসবাস করেন। তাঁর পরিবারের লোকেরা কি জানে যে, তিনি কত বড় ব্যক্তিত্ব? আমরা তাও জানি না। তবে তিনি স্বপরিবারে বসবাস করেন এবং আমাদের মতই কোন বসত বাড়িতে থাকেন। তিনি বাড়ি থেকে বের হন এবং সব ধরনের কাজকর্ম এবং ইবাদত বন্দেগী করেন। এই সকল কুসংস্কার ইমাম মাহদীর (আ.) গাইবাতের বিষয় নয়। তাহলে ইমাম মাহদীর (আ.) গাইবাতের প্রকৃত অর্থ কি?

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) ইমাম মাহদীর (আ.) গাইবাতকে হযরত ইউসুফ (আ.)-এর সাথে তুলনা করেছেন। হযরত ইউসুফ (আ.) যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তিনি তাঁর ভাইদের থেকে আলাদা ও গাইবাতে ছিলেন। ইমাম মাহদীর (আ.) গাইবাতও ঠিক এমনই একটি গাইবাত।

হযরত ইউসুফ (আ.) যখন মিশরের সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। তখন তাঁর পিতার গ্রাম অর্থাৎ কিনয়ানে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। মিশরের মন্ত্রীর সুনাম এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে, পিতার নির্দেশে ইউসুফের ভাইরা হযরত ইউসুফের কাছে গম ও খাদ্য নেয়ার জন্য আসেন। তারা পরপর দুইটি সফরে আসেন এবং হযরত ইউসুফের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করেন তারপরও কিন্তু তারা হযরত ইউসুফকে (আ.) চিনতে পারে নি। এই ইউসুফ হচ্ছেন তাদেরই ভাই, যাকে তারা শত্রুতা ও হিংসার বসে হত্যা করতে চেয়েছিল। এখন তারা ইউসুফের (আ.) সাথে কথা বলছে, দেখা করছে, সম্মান জানাচ্ছে অথচ তারা তাঁকে চিনতে পারছে না। শুধু তাই নয় ইউসুফ তাদের সহদর ভাই ছিলেন তারপরও কিন্তু তারা তাঁকে চিনতে পারে নি। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর অনুমতি পেয়ে হযরত ইউসুফ (আ.) ভাইদের নিকট নিজের পরিচয় তুলে ধরলেন। ইমাম মাহদীর (আ.) গাইবাতও ঠিক এমনই। জনগণ তাকে রাস্তা-ঘাটে, বাজারে, মসজিদে, হজে, কারবালায় ইত্যাদি জায়গায় সর্বদা সাক্ষাত করছে, কিন্তু তাঁকে চিনতে পারছে না। তাঁর সাথে তাওয়াফ করছে, সাফা মারওয়া সাঈ করছে, ইমাম রেজার (আ.) মাজারে যাচ্ছে কিন্তু চিনতে পারছে না। 

তবে হ্যাঁ, যেগুলো গোনাহের স্থান যেমন: সিনেমা হল, মদের আসর ইত্যাদি সেখানে কেউ ইমাম মাহদীর (আ.) সাক্ষাত পাবে না। যে সকল পার্কে অসামাজিক কর্মকাণ্ড হয় সেখানে ইমাম মাহদীর সাক্ষাত পাওয়া যাবে না। কিন্তু পথে-ঘাটে, হাট বাজারে, মসজিদে, যিয়ারাতের স্থানে এবং হজে বারংবার ইমাম মাহদীর (আ.) সাথে সাক্ষাত হয়। এবং ইমাম মাহদীকে (আ.) তারা এতটাই ভালবেসে ফেলেন যে, তারা বলে তিনি কতই না ভাল মানুষ, কত দয়ালু, কতই না ব্যক্তিত্বপূর্ণ মানুষ, কতই না মোত্তাকি পরহেজগার এবং কতবেশী ধার্মিক ছিলেন। তার থেকে তারা অনেক কিছু পেয়েও থাকেন। এরপর ইমাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যয় কিন্তু তারা হয়ত বুঝতেও পারে না যে, তিনিই ইমাম মাহদী (আ.) ছিলেন। এটাই হচ্ছে ইমাম মাহদীর গাইবাতের প্রকৃত অর্থ। গাইবাত অর্থাৎ তাকে দেখেও চিনতে না পারা। এটাই হচ্ছে যুগের ইমামের গাইবাতের ভাবার্থ এবং এর অন্য কোন অর্থ নেই। সুতরাং যারা বলে তিনি ধোয়া হয়ে গেছেন, আসমানে চলে গেছেন, তাঁর কোন শরীর নেই, গুহায় বাস করেন, কুয়ার মধ্যে বাস করেন এগুলো সবই হচ্ছে কুসংস্কার। আমরা যে গাইবাতে বিশ্বাস করি তা হচ্ছে ইমাম মাহদী (আ.) আমাদের মাঝেই আছেন কিন্তু আমরা তাকে সচরাচর দেখতে পাই না এবং দেখলেও চিনতে পারি না। 

মরহুম শেইখ হাসান আলী ইস্পাহানী (রহ.), যিনি অত্যন্ত নামকরা আধ্যাত্মিক আলেম ছিলেন এবং যার খ্যাতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল, তাকে সুসংবাদ দেয়া হল যে, অমুক দিন, অমুক সময়ে, অমুক ফার্নিচারের দোকানে ইমাম মাহদীর (আ.) সাথে তোমার সাক্ষাৎ হবে। তিনি নির্দিষ্ট দিনে সেই দোকানে প্রবেশ করলেন এবং দেখলেন যে, দোকানের মালিক চেয়ারে বসে নিজের হিসাব কিতাব নিয়ে ব্যস্ত রয়েছে। ইমাম মাহদী (আ.) তার পাশের চেয়ারেই বসে আছেন কিন্তু দোকানদার সেদিকে কোন খেয়ালই করছে না। মরহুম শেইখ হাসন আলী ইমাম মাহদীকে (আ.) সালাম দিলেন। ইমাম মাহদী (আ.) সালামের জবাব দিয়ে বললেন: হে শেইখ! তুমি কি চাও? তখন শেইখ নিজের প্রয়োজনের কথা বললেন এবং ইমাম মাহদী (আ.) নিজের পকেট থেকে টাকা বের করে শেইখ হাসান আলীকে দিয়ে দোকান থেকে বের হয়ে গেলেন। ইমাম মাহদী (আ.) চলে যাওয়ার পর শেইখ হাসান আলী দোকানদারকে বললেন: তোমার এই বন্ধু কোন কোন সময়ে তোমার দোকানে আসেন? যাতে আমার যদি কোন কাজ থাকে তাহলে আবারও সেই সময়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে পারব? দোকানদার বললেন: আমি সঠিক জানি না। তবে তিনি মাঝেমধ্যেই আমার দোকানে আসেন। এই ঘটনা থেকে আমরা দু’টি জিনিস জানতে পারি। একটি হচ্ছে শেইখ হাসান আলী এতটা মহান ছিলেন যে, তিনি ইমাম মাহদীকে (আ.) দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন এবং তাকে চিনতেও পেরেছিলেন। আর দ্বিতীয় হচ্ছে দোকানদার বারংবার ইমাম মাহদীর (আ.) সাথে সাক্ষাত করেছেন, তাঁর সাথে কথাবার্তা বলেছেন, মনের কথা তাকে বলেছেন, কিন্তু তিনি ইমাম মাহদীকে (আ.) চিনতে পারেন নি। হয়ত সপ্তাহে কয়েকবার তাঁর সাথে ইমাম মাহদীর সাক্ষাৎ হয়েছে, কিন্তু তারপরও সে ইমামকে চিনতে পারেনি। আর এটাই হচ্ছে ইমাম মাহদীর (আ.) গাইবাতের প্রকৃত অর্থ।

গাইবাত তথা অন্তর্ধানের যুগে মানুষ ইমাম মাহদী (আ.) থেকে উপকৃত হচ্ছে যেভাবে সূর্যের আড়ালে থাকা সূর্য থেকে আমরা উপকৃত হয়ে থাকি। ওই সময়ে চোখ দিয়ে সূর্য দেখা না গেলেও সূর্যের আলো কিন্তু ঠিকই আমাদের কাছে পৌঁছে যায়। সূর্যের আকর্ষণ ঠিকই কাজ করে। মানুষ যেহেতু ইমাম মাহদীর (আ.) ঠিকানা জানে না, তাই তারা ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে চিনে না এবং তাঁর খেদমতে পৌঁছাতে পারে না। কিন্তু তাঁর জ্ঞানের ভাণ্ডর থেকে, তাঁর হেদায়াত থেকে এবং তাঁর সাহায্য থেকে ঠিকই উপকৃত এবং লাভবান হয়ে থাকে। এভাবে নানাবিধ উপায়ে মানুষ ইমাম মাহদীর (আ.) মহান অস্তিত্ব থেকে উপকৃত হয়ে থাকে। সুতরাং আমরা সকলেই বর্তমানে ইমাম মাহদীর (আ.) অফুরন্ত দস্তরখানায় বসে তাঁর থেকে লাভবান হচ্ছি। যে ব্যক্তি নিজেকে যত বেশী ইমাম মাহদীর (আ.) সূর্যের কিরণের সান্নিধ্যে নিয়ে যাবে সে তত বেশী তা থেকে উপকৃত হবে। যারা যত বেশী তাঁর উপর ভরসা করবে, তাঁর গুণগান করবে, তাঁর প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করবে তারা ইমাম মাহদী (আ.) থেকে বেশী উপকৃত হবে।

পঞ্চম সাদৃশ্য

রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে যে, ইমাম মাহদী (আ.) দীর্ঘায়ুর অধিকারী এবং তাঁর দীর্ঘায়ুকে হযরত নুহ (আ.) এবং হযরত খিজির (আ.)-এর সাথে তুলনা করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হচ্ছে হযরত নুহ (আ.) তুফানের আগে ৯৫০ বছর জীবন-যাপন করেছেন। বিভিন্ন রেওয়ায়েতের ভাষ্য অনুযায়ী তাঁর মোট আয়ু হচ্ছে ২৪৫০ বছর। ইহুদিরাও পর্যন্ত বিশ্বাস করে যে, হযরত নুহ (আ.) দীর্ঘায়ুর অধিকারী ছিলেন। খ্রিস্টানরাও বিশ্বাস করে, আহলে সুন্নত বিশ্বাস করে, সকল মুসলমানগণ বিশ্বাস করে। কোরআন স্বীকৃতি দেয় এবং তাওরাতও স্বীকৃতি দেয়। হে মুসলমান! তুমি হযরত নুহের ২৪৫০ বছর বয়সকে মেনে নিতে পার। আর অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, ইমাম মাহদীর (আ.) বয়স তার অর্ধেকও হয় নি, তারপরও তোমরা তা বিশ্বাস করতে পারছ না।

হযরত খিজির (আ.) হযরত মুসার (আ.) যুগে ছিলেন এবং হযরত ঈসার যুগেও ছিলেন, এখনও আছেন। মুসা (আ.) যুগে তাঁর বয়স ছিল ৫০ বছর। হযরত মুসার (আ.) ১৩৫০ বছর পর হযরত ঈসা (আ.) আসেন। তাহলে ওই পর্যন্ত তাঁর বয়স হল ১৪০০ বছর। সেখান থেকেই এই পর্যন্ত হল ২০০০ বছর। তাহলে হযরত খিজিরের (আ.) মোট বয়স হচ্ছে: ৩৫০০ বছর। সকলেই বিশ্বাস করে যে হযরত খিজির এখনও জীবিত আছেন এবং তাঁর বয়স ৩৫০০ বছর। তোমরা হযরত খিজিরের (আ.) দীর্ঘায়ু মেনে নিতে পার। আর আল্লাহর হুজ্জাত যুগের ইমাম হযরত মাহদীর (আ.) ১৪০০ বছর মেনে নিতে কষ্ট হয়। আল্লাহ নিজেই বলেছেন তিনি সকল বিষয়ে ক্ষমতা রাখেন। সূরা বাকারার ১০৬ নং আয়াতে বলা হয়েছে:

أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

তুমি কি জান না যে, নিশ্চয় আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান?

অনুরূপভাবে সূরা বাকারার ১০৭ নং আয়াতেও বলা হয়েছে:

أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ

তুমি কি জান না যে, একমাত্র আল্লাহর জন্যেই আসমান ও জমিনের আধিপত্য।

তুমি কি জান না যে, আকাশমণ্ডলী ও ভূমণ্ডলের রাজত্ব কেবল আল্লাহরই?

ষষ্ট সাদৃশ্য

ইমাম মাহদীর (আ.) আবির্ভাবের সময় কিয়ামত অনুষ্ঠিত হওয়ার সময়ের মতই গোপন একটি বিষয়। যা কারও জন্য প্রকাশ্য ও স্পষ্ট নয়। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:

مَثَلُهُ کَمَثَلِ السّاعۀِ لا تَاتیکُم اِلّا بَغتَهً

তার উদাহরণ হচ্ছে কিয়ামতের সময়ের মত।

আল্লাহর নবীগণের ইলমে গাইব আছে কিন্তু তাঁরা কিয়ামত কবে অনুষ্ঠিত হবে তা জানেন না। জিবরাইল (আ.)-এর ইলমে গাইব আছে কিন্তু কিয়ামত কবে এবং কখন হবে তা জানে না। কেউই কিয়ামতের মত ইমাম মাহদীর (আ.) আবির্ভাবের সময় সম্পর্কে জানে না। এমনকি মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এবং স্বয়ং ইমাম মাহদীও (আ.) তা জানেন না।

তিনি নিজেই আমাদের মত আল্লাহর নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন। যখনই আল্লাহর নির্দেশ হবে, তিনি আবির্ভূত হবেন। সুতরাং যেই নির্দিষ্ট করে বলবে যে, ইমাম মাহদী (আ.) ২০ বছর পর, ৫০ বছর পর অথবা ১০০০ বছর পর আবির্ভূত হবেন সে মিথ্যাবাদী। কেননা সে এমন একটি দাবি করছে যা নবীরাও জানে না। সুতরাং কিয়ামত কবে অনুষ্ঠিত হবে এবং ইমাম মাহদীর (আ.) আবির্ভাব করে হবে তা একমাত্র আল্লাহই জানেন।

ইমাম মাহদীর (আ.) প্রতি আমাদের কর্তব্য কি? বর্তমানে আমরা তাঁর প্রতি কি কি দায়িত্ব পালন করতে পারি?

অনেক বড় বড় আলেম ও পণ্ডিতগণ ইমাম মাহদীর (আ.) প্রতি আমাদের যে সকল দায়িত্ব রয়েছে তার সংখ্যাকে ৮০টি উল্লেখ করেছেন। সুতরাং ইমাম মাহদীর (আ.) প্রতি আমাদের দায়িত্ব অধিক এবং অনেক বেশী। আমি এখানে মাত্র কয়েকটি অধিকারের কথা উল্লেখ করব। যাতে সবার আগে আমি নিজে এবং পরবর্তীতে সকলেই সেই দায়িত্বসমূহ সঠিকভাবে পালন করতে পারি। দোয়া নুদবায় বলা হয়েছে: و اَعِنّا عَلی تأدِیَهِ حُقوقِه اِلیهِ আমরা যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত হই, যারা ইমাম মাহদীর (আ.) প্রতি দায়িত্ব পালনে সদা সচেষ্ট রয়েছেন।

প্রথম দায়িত্ব

ইমাম মাহদীর (আ.) প্রতি আমাদের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে সর্বদা তাঁর আবির্ভাবের জন্য দোয়া করা। যখন তোমার বাবা সফরে যায়, তোমার ভাই পড়ালেখার জন্য অন্য শহরে যায়, তোমার চাচা এবং আত্মীয়স্বজন যখন কোথায় যিয়ারাত করতে বা বেড়াতে যায় তখন তোমরা কি তাদের জন্য দোয়া কর না? অবশ্যই তোমরা এভাবে দোয়া কর, হে আল্লাহ! তাকে সুস্থ রাখুন, তাকে সকল প্রকার বালা-মুসিবত থেকে রক্ষা করুন। অবশ্যই তোমরা তাদের নিরাপত্তার জন্য এভাবেই দোয়া কর, সদকা দাও ইত্যাদি। তাহলে ইমাম মাহদী (আ.) কি বর্তমানে আমারদের সবার প্রকৃত পিতা নন? সুতরাং সর্বদা তাঁর সুস্থতা ও নিরাপত্তার জন্য দোয়া করতে হবে। তাঁর আবির্ভাবের জন্য দোয়া করতে হবে। নামাজের কুনুতে ... اَللّهُمَّ كُنْ لِوَلِيِّكَ الْحُجَّةِ بْنِ الْحَسَنِ  দোয়াটি পড়তে হবে। অত্যন্ত বড় মারজায়ে তাকলিদ আয়াতুল্লাহ খুয়ী (রহ.) তেহরানের একজন আলেমকে বলেছিলেন: “আমি ৫০ বছর ধরে নামাজের কুনুতে اَللّهُمَّ كُنْ لِوَلِيِّكَ... দোয়াটি পাঠ করছি”।

আপনাদের কি মনে হয় যে, আয়াতুল্লাহ খুয়ীর (রাহ.) মত এমন মহান মারজায়ে তাকলিদ এই দোয়া ছাড়া অন্য কোন দোয়া জানতেন না? না, অবশ্যই জানতেন, কিন্তু তিনি এটা দায়িত্ব মনে করতেন এবং সকল দোয়ার চাইতে এই দোয়াটিকেই বেশী প্রাধান্য দিতেন। নামাজের আগে, নামাজের মধ্যে, নামাজের পর, দোয়ার মধ্যে মোটকথা সর্বদা যখনই সালাওয়াত পাঠ করবে তখনই শেষে  وَ عَجِّل فَرَجَهُم  (ওয়া আজ্জিল ফারাজাহুম) বলবে এবং ইমাম মাহদীর (আ.) আবির্ভাবের জন্য দোয়া করব। নিজের যে কোন সমস্যা এবং চাহিদার থেকে ইমাম মাহদীর (আ.) আবির্ভাবের জন্য দোয়া করাকে সর্বদা প্রাধান্য দিবে।

হে আমার ভাই ও বোনেরা! আপনারা এই কাজের গুরুত্বকে অনুধাবন করুন এবং এই দায়িত্বের গুরুত্বকে বোঝার চেষ্টা করুন। তোমরা যদি এই  কাজটি করতে পার এবং এই বিষয়টি যদি ইমাম মাহদীর কাছে পৌঁছে যায় যে তুমি মসজিদে, নামাজে, কুনাতে দোয়াতে সর্বদা اَللّهُمَّ كُنْ لِوَلِيِّكَ... দোয়াটি পাঠ করছ, তাঁর আবির্ভাবের জন্য দোয়া করছ। ইমাম রেজার (আ.) যিয়ারাতে গিয়ে তাঁর জন্য দোয়া করছ, ইমাম হুসাইনের (আ.) যিয়ারাতে গিয়ে তাঁর জন্য দোয়া করছ। তখন তিনিও তাঁর নিজের নামাজে তোমার জন্য দোয়া করবেন। 

যুগের ইমামও কিন্তু অনেক দয়ালু, তিনি তোমাদের দেনাসমূহকে সাথে সাথে পরিশোধ করে দিবেন। তিনি দয়ালু পরিবারের সন্তান। যতটা সম্ভব তাঁর জন্য দোয়া কর এবং এই দায়িত্ব পালনে মোটেও অবহেলা করবে না। কেননা ইমাম মাহদী (আ.) নিজেই নির্দেশ দিয়ে বলেছেন: وَ اَکثِروا الدُّعاء بِتَعجیلِ الفرج আমার আবির্ভাবের জন্য বেশী বেশী দোয়া কর। কেনা এর মধ্যেই তোমাদের সকল কল্যাণ নিহিত রয়েছে।

দ্বিতীয় দায়িত্ব

তাঁর জন্য দান-খয়রাত করা। মহান আল্লাহ তোমাদেরকে যে সকল ভাল ও মুস্তাহাব কাজ করার তৌফিক দান করেছেন তার একটি অংশকে আর যদি বুদ্ধিমান হও তাহলে পুরোটাকেই ইমাম মাহদীর (আ.) জন্য পালন কর। তোমরা যখন ইমাম হুসাইন (আ.), ইমাম রেজা (আ.)-এর যিয়রাত করতে যাও তখন তোমরা নিজেদের বাবা, মা, ভাই বোন, আত্মীয় স্বজনের নাম ধরে দোয়া কর। তাদের পক্ষ থেকে নামাজ পড়, যিয়রাত পাঠ কর। আমি বলতে চাচ্ছি তোমরা যখন ইমাম রেজার (আ.) যিয়ারাতে যাবে, তখন পুরোটাই ইমাম মাহদীর (আ.) নামে উৎসর্গ কর। যখন কোরআন তিলাওয়াত করবে পুরোটাই ইমাম মাহদীর (আ.) নামে উৎসর্গ কর। যিয়রাতে আশুরা পাঠ করলে, ইমাম মাহদীর (আ.) পক্ষ থেকে পাঠ কর। হজ ও ওমরা পালন করলে তা ইমাম মাহদীর (আ.) পক্ষ থেকে তাওয়াফ কর। কোন জানাজায় অংশগ্রহণ করলে, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখলে, পিতা-মাতার আদেশ পালন করলে, ফকীর মিসকিনকে সাহায্য সহযোগিতা করলে এবং যত ধরণের ভাল কাজের আদেশ আল্লাহ দিয়েছেন, তা পালন করলে তার সওয়াবকে ইমাম মাহদীর (আ.) নামে হাদিয়া করে দাও।

জনৈক ব্যক্তি ইমাম জাওয়াদ (আ.) এর কাছে বললেন: আমি যখন হজে গেলাম প্রথম দিন মহানবী হযরত মুহাম্মাদের (সা.) পক্ষ থেকে তাওয়াফ করলাম, দ্বিতীয় দিন আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলীর (আ.) পক্ষ থেকে তাওয়াফ করলাম, তৃতীয় দিন ইমাম হাসানের (আ.) পক্ষ থেকে এবং চতুর্থ দিন ইমাম হুসাইনের (আ.) পক্ষ থেকে তাওয়াফ করলাম। এভাবে দশম দিনে আপনার পক্ষ থেকে তাওয়াফ করলাম। এছাড়াও কখনো কখনো দিনে দুই বার তাওয়াফ করতাম তখন খাতুনে জান্নাত ফাতিমা যাহরার (সা. আ.) পক্ষ থেকেও তাওয়াফ করতাম। ইমাম জাওয়াদ (আ.) জবাবে বললেন: اِستَکثِر مِن هذا এই কাজটি বেশী করে পালন কর। অর্থাৎ মাসূমগণের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব তাওয়াফ কর। فَاِنَّهُ اَفضَلُ ما اَنتَ عامِلُهُ اِن شاءالله কেননা এটাই হচ্ছে তোমার পক্ষ থেকে সর্বোত্তম কাজ।

এটা ছিল ইমাম মাহদীর (আ.) প্রতি আমাদের দ্বিতীয় দায়িত্ব। এবার তৃতীয় দায়িত্ব সম্পর্কে বলে আলোচনা শেষ করব।

তৃতীয় দায়িত্ব

ইমাম মাহদীর (আ.) সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:

يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَ كُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ

হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং (সর্বদা) সত্যবাদীদের সঙ্গে থাক। (তাওবা -১১৯)

মহান আল্লাহ বলছেন: হে মু’মিনগণ! তোমরা তাকওয়া অর্জন কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক। একজন ঈমানদারকে অবশ্যই কাজে-কর্মে সৎ ও নিষ্ঠাবান হতে হবে। শুধু মুখে বললেই ঈমান অর্জিত হয় না। অন্তরে বিশ্বাস, মৌখিক ঘোষণা এবং কার্যে তা পরিণত করাকে ঈমান বলা হয়। অর্থাৎ যে মিথ্যা বলবে না, যার কথায় এবং কাজে মিল থাকবে, ভিতর বাহির সমান হবে, নিয়ত এবং আমল একই হবে। আর নিষ্পাপ মাসূম (আ.) ছাড়া কারও মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান নেই। সুতরাং এখানে সত্যবাদীদের সঙ্গী হওয়া বলতে মাসূম ইমামগণের (আ.) সঙ্গী হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অতএব كُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ এর অর্থ হল, যারা হযরত আলীর (আ.) যুগে আছ, তারা সকলেই হযরত আলীর (আ.) সঙ্গী হয়ে থাকবে, অন্য কারও সাথে নয়। ইমাম রেজা (আ.)-এর যুগের মানুষ ইমাম রেজার সাথেই থাকবে। আর গাইবাত তথা বর্তমান যুগের মানুষ, তোমরা আলে মুহাম্মাদের মাহদীর (আ.) সাথেই থাক। অর্থাৎ তোমাদেরকে সর্বদা সজাগ থাকতে হবে যে, ইমাম মাহদী (আ.) গাইবাতে আছে বলে তোমরা তাকে ছেড়ে অন্য কারও অনুসরণ করবে তা হবে না। তোমাদের ইমাম আছে। যিনি উপস্থিত এবং জীবন্ত, তাঁর দিকেই ধাবিত হও। তাঁর ঠিকানা না জানলেও আন্তরিক ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের পথ তো বন্ধ নেই বরং সেটা সর্বদা খোলাই রয়েছে। তাঁকে অন্তর থেকে সর্বদা ডাকতে থাক।  

প্রিয় বন্ধুগণ! ইমাম মাহদীর (আ.) সাথে সম্পর্ক স্থাপন করার জন্য মসজিদ, মেহরাব এবং ওজুর প্রয়োজন হয় না। এমনকি আরবী জানারও কোন প্রয়োজন নেই। তুমি বাসে বসেই ইমাম মাহদীর (আ.) সাথে কথা বলতে পার। কলেজের শ্রেণীকক্ষের ভিতরে, বাজারের অভ্যন্তরে, এদিকে ওদিকে পথে প্রান্তরে, দোকানে, বাড়িতে এবং সর্বত্র যুগের ইমামের সাথে কথা বল। তাঁর সাথে গোপনে নির্জনে কথা বল, তিনি তোমার কথা শুনছেন। তাঁর নিকট তোমার সমস্যার কথা তুলে ধর এবং তাঁর উপর ভরসা কর। এমন একটি দিনও অতিবাহিত হয় না যে, ইমামের সাথে আমাদের সংযোগের সুযোগ থাকে না। অর্থাৎ সর্বদা তাঁর সাথে যোগাযোগের পথ আমাদের জন্য খোলা রয়েছে। এখানেই আলোচনা শেষ করছি। আমাদের এই আলোচনার ফলাফল নিম্নরূপ:

আলোচনার ফলাফল:

১। যুগের ইমামের মারেফাত অর্জন করাই হল বর্তমান যুগে ধার্মিকতা রক্ষা ও মুক্তির একমাত্র উপায়।

২। ইমাম মাহদী (আ.) এবং তাঁর আবির্ভাবের প্রতি বিশ্বাস পূর্ববর্তী সমস্ত ধর্মে রয়েছে।

৩। যুগের ইমামের (আ.) প্রতি বিশ্বাস হল, একটি কোরআন ভিত্তিক বিশ্বাস, রেওয়ায়েত ভিত্তিক বিশ্বাস, একটি ধর্মীয় ও ইসলামিক বিশ্বাস, এই বিশ্বাস রাখা প্রতিটি মুসলমানের জন্য ওয়াজিব এবং জরুরী।

৪। যুগের ইমামের নাম মহানবী হযরত মুহাম্মাদের (সা.) নামের অনুরূপ এবং তাঁর বিখ্যাত উপাধি হল হযরত ইমাম মাহদী।

৫। ইমাম মাহদী (আ.) ২৫৫ হিজরির ১৫ই শাবান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মও হযরত ইব্রাহীম (আ.) ও হযরত ঈসার (আ.) ন্যায় গোপনে হয়েছিল।

৬। যুগের ইমামের ইমামতের সূচনাও হযরত ইয়াহিয়া (আ.) এবং হযরত ঈসার (আ.) ন্যায় শৈশবেই হয়েছিল।

৭। ইমাম মাহদীর (আ.) গাইবাত হল হযরত ইউসুফের ন্যায়। কেননা তাঁর ভাইরা তাঁকে দেখত কিন্তু তাঁকে চিনতে পারত না। আমরাও ইমাম মাহদীকে দেখি কিন্তু আমরা তাঁকে চিনতে পারি না।

৮। ইমাম মাহদী (আ.) হযরত নুহ (আ.) এবং হযরত খিজির (আ.)-এর ন্যায় দীর্ঘ হায়াতের অধিকারী। তবে তার বয়স এখনও হযরত নুহের অর্ধেক এবং হযরত খিজিরের তিন ভাগের এক ভাগও হয় নি।

৯। অন্তর্ধানের যুগের মানুষ সূর্যের আড়ালে থাকা সূর্যের ন্যায় ইমাম মাহদীর (আ.) মহান অস্তিত্ব থেকে লাভবান ও উপকৃত হয়ে থাকে।

১০। যুগের ইমামের আবির্ভাবের সময়টি পুনরুত্থান দিবসের মতই সমস্ত মানুষের নিকট অজানা এবং অস্পষ্ট।

১১। ইমাম মাহদীর প্রতি আমাদের অনেক দায়িত্ব কর্তব্য রয়েছে এবং আমাদের উপর যুগের ইমামের অনেক অধিকার রয়েছে।

১২। তার মধ্যে তিনটি দায়িত্ব হল, নিম্নরূপ:

(ক) দোয়া করার দায়িত্ব।

(খ) মহান ইমামের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব। যেমন: তাঁর পক্ষ থেকে কোরআন তিলাওয়াত করা, যিয়ারাত করা, সদকা দেয়া ইত্যাদি।

(গ) ইমামের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও সংযোগের দায়িত্ব।

হে আল্লাহ! ইমাম মাহদীর ওসিলায় তাঁর আবির্ভাবকে ত্বরান্বিত করে দিন।

ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের অন্তরায় বা বাধা এবং তাঁর অনুপস্থিতির কারণসমূহের অবসান ঘটিয়ে দিন।

আমাদের নগণ্য সালাম  ও শুভেচ্ছাকে এই মুহূর্তে তাঁর নিকটে পৌঁছে দিন।

যুগের ইমামের (আ.) আশীর্বাদ ও দোয়া আমাদের সকলের নসিব (ভাগ্যে নির্ধারণ) করুন।

যুগের ইমাম, তাঁর পরিবার, তাঁর সন্তান, তাঁর শিয়া ও তাঁর মহব্বতকারীদেরকে আপনার সমর্থনের মাঝে বর্তমান সময়ের সকল বিপদাপদ, অনিষ্ট ও কুফল থেকে রক্ষা করুন।

ইমাম মাহদীর (আ.) শত্রুদেরকে লাঞ্ছিত ও ধ্বংস করুন। আর তাঁর বন্ধুদেরকে সফল ও সম্মানিত করুন।

ভাষান্তর: ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষা বিভাগীয় প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন ড. মো. আলী মোর্ত্তজা

নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য:
* captcha: