ইকনা প্রতিবেদনে, আল-মাসিরাহ টেলিভিশনে আব্বাস আল-কায়েদি লিখিত এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের দোসরদের ইয়েমেনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রবেশ এবং শিক্ষা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের স্বার্থে পরিচালনা করার চেষ্টা করেছে। শিক্ষাকে ধ্বংস করে বিষয়বস্তুশূন্য করার একটি বিশেষ মার্কিন কৌশল, ইউরোপের অর্থায়ন ও সহযোগিতায় ইয়েমেনে বাস্তবায়িত হয়েছে।
১৯৯৭ সালে বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের অংশ হিসেবে ইয়েমেনের শিক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণা শুরু করে এবং “প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি” নামে একটি ধ্বংসাত্মক প্রকল্প তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬০ মিলিয়ন ডলারের ঋণে চালু এই কর্মসূচি বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার মেয়েদের লক্ষ্যবস্তু করে বিভ্রান্তিকর ধারণা শেখায়, যার আড়ালে বলা হয় “শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন।”
১৯৮০-এর দশকের গোড়াতেই সানায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে “শিক্ষা উন্নয়ন”-এর নামে ইয়েমেনের শিক্ষাকে ধ্বংসের কাজ শুরু করে। এর মধ্যে ছিল মন্ত্রণালয়ের শিক্ষাকর্মীদের বিদেশে পাঠানো, থিসিসে হস্তক্ষেপ, শিক্ষা কাঠামোকে মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা এবং প্রাথমিক পর্যায়ের পাঠ্যবই পুনর্লিখন।
২০০۰ সালে ইয়েমেনের তৎকালীন সরকার বিশ্বব্যাংক প্রদত্ত প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করে, যা স্কুল সংস্কারের আড়ালে আমেরিকার শিক্ষাধ্বংসী কৌশল বাস্তবায়ন করেছিল। এই যৌথ প্রকল্পের বাজেট ছিল ১২০ মিলিয়ন ডলার।
২০০৪ সালে ইয়েমেন সরকার, বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ, ডব্লিউএফপি, আইএলও, ইউনেস্কো এবং ইউরোপীয় কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল ইয়েমেনে প্রাথমিক শিক্ষাধ্বংসকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া।
২০০২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ইয়েমেন সরকার ছয়টি ভিন্ন মার্কিনপন্থী শিক্ষাকৌশল গ্রহণ করে, যা প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
১৯৮০-এর দশক থেকেই সিআইএ ইয়েমেনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। লক্ষ্য ছিল ইয়েমেনি সমাজকে অজ্ঞ ও বশ্যপরায়ণ করে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল করে রাখা। ইয়েমেনি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ধরা পড়া মার্কিন-ইসরায়েলি গুপ্তচর নেটওয়ার্ক এই বিষয়টি প্রমাণ করেছে।
১৯৯০-এর পর থেকে সিআইএ-র অধীনস্থ সংস্থা EDC জর্ডান থেকে ইয়েমেনের প্রাথমিক পাঠ্যবই প্রস্তুতির কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এর মাধ্যমে মার্কিন ধ্যান-ধারণা পাঠ্যবইয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো।
২০০২ সালে ওয়াশিংটন ইয়েমেনে তথাকথিত “দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ” চালু করে, যা মূলত শিক্ষায় মার্কিন লক্ষ্য দ্রুত বাস্তবায়নের একটি বিশ্বব্যাপী প্রকল্প ছিল। এ-সংক্রান্ত সম্মেলনগুলো ব্রাসেলস ও প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় এবং দাতাদের সহায়তায় অনুমোদিত হয়।
২০০৪ সালে ইয়েমেন সরকার আমেরিকা থেকে ১০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা পায়, যা কয়েকটি প্রদেশে শিক্ষাধ্বংসে ব্যবহার করা হয়। এর সঙ্গে জড়িত ছিল ইউএসএআইডি ও মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
মার্কিন কৌশলের আড়ালে পাঠ্যক্রমে যৌন বিষয়ক ধারণা, বিদেশি প্রতীক ও উৎসব, ইসলামী বিষয় বাদ দেওয়া, বিশেষত তাওহীদ ও কোরআনের আয়াত বাতিল করা, এবং রাসূল (সা.)-এর যুদ্ধসমূহ (যা ইহুদিদের বিরুদ্ধে হয়েছিল) উপেক্ষা করা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে প্রস্তুত করা হচ্ছিল।
২০১০ সালে বিশ্বব্যাংক ১৩ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প চালু করে, যা ইয়েমেনের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমেরিকার ধ্বংসাত্মক শিক্ষা পরিকল্পনা ঢুকিয়ে দেয়।
২০১২ সালে ব্যাংকটি ৬৫ মিলিয়ন ডলারের আরেকটি সহায়তা দেয়, যার লক্ষ্য ছিল বিশেষত মেয়েদের ও কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ২০১৩ সালে আবার ২০৬ মিলিয়ন ডলারের তিনটি নতুন প্রকল্প ঘোষণা করে।
২০২০ সালে বিশ্বব্যাংক ১৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের মাধ্যমে আবারও শিক্ষাধ্বংসের পরিকল্পনা শুরু করে, যা ২০২৪ পর্যন্ত ইউনিসেফ, ডব্লিউএফপি ও সেভ দ্য চিলড্রেনের মাধ্যমে চালু থাকে। একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ১৮ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্প চালু করে।
এই সব কৌশল ও প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল ইয়েমেনের শিক্ষাকে ধ্বংস করা, শিক্ষার্থীদের দুর্বল করে তোলা এবং স্কুলগুলোকে পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রচারের কেন্দ্রে পরিণত করা। তবে ২১ সেপ্টেম্বরের বিপ্লবের পর এই ষড়যন্ত্রগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে প্রতিহত হয়। 4300062#