IQNA

20:03 - November 11, 2019
সংবাদ: 2609611
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পুরুষ ও ব্যক্তিত্ব মহানবী মুহাম্মদ (সা.)। তাঁর স্তুতি-বন্দনায় পৃথিবীর অজস্র ভাষায় বহু কবি-লেখক শব্দ গেঁথেছেন। বাক্যের সৌধ নির্মাণ করেছেন। তাঁর আদর্শ পৃথিবীর সর্বকালের সর্বোৎকৃষ্ট ও মানবতাঘনিষ্ঠ আদর্শ। যার তুলনা শুধুই তাঁর ‘উসওয়াতুন হাসানাহ’ বা সর্বোৎকৃষ্ট আদর্শ।

বার্তা সংস্থা ইকনা'র রিপোর্ট: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ-প্রদেশের অমুসলিমরাও মহানবী (সা.)-এর বন্দনায় মেতেছেন। ভারতের প্রচুর হিন্দু ঠাকুর ও ধর্মীয় পণ্ডিত মহানবী (সা.)-এর সম্মানে কবিতা রচনা করেছেন। নিজেরা আবার অনুষ্ঠানে আবৃত্তি করেছেন। মহানবী (সা.)-এর সম্মানে হিন্দু ধর্মীয় গুরু-পণ্ডিত শ্রী আচার্য্য প্রমোদ কৃষ্ণ ও পণ্ডিত রামসাগর পৃথ্বিপাল ত্রিপাঠীসহ অনেক অমুসলিম ধর্মবেত্তার কবিতা পাঠের বেশ কিছু ভিডিও ইউটিউবে রয়েছে।

রাসুল-কবি সাহাবি হাসসান বিন সাবিত (রা.) এক কবিতায় বলেছেন, ‘মা ইন মাদাহতু মুহাম্মাদান বি কাসিদাতি, ওয়া লাকিন মাদাহতু কাসিদাতি বি মুহাম্মাদি... ’

অর্থাৎ আমি যখনই কবিতার মাধ্যমে মুহাম্মদের স্তুতি-গান গেয়েছি, ততবারই আমি মুহাম্মদের মাধ্যমে আমার কবিতাকে প্রশংসিত করেছি।

বস্তুত যুগ যুগ ধরে যাঁরা মহানবী (সা.)-কে নিয়ে আলোচনা করেছেন, কবিতার পঙিক্ত গেঁথেছেন কিংবা শব্দের মঞ্জিমা তৈরি করেছেন, তাঁরা সতত প্রশংসিত হয়েছেন। ইতিহাস তাঁদের নিয়ে কথা বলেছে। যুগ পরম্পরায় তাঁরা আলোচিত হয়েছেন।

রাসুল বন্দনায় কবিতা লিখেছেন এমন একজন হলেন মধ্যযুগীয় চীনা মিং সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট হংউও। তিনি মহানবী (সা.)-এর প্রশংসা করে কবিতা লিখেছেন। তাঁর স্তুতি-কবিতাটি ‘বাইজিজান’ নামে পরিচিত। ১০০ শব্দের কাঠামোবন্ধনে তিনি চীনা ভাষায় স্তুতিগাথাটি রচনা করেছেন।

রাসুল-মুগ্ধতায় রচিত তাঁর কবিতাটি এখানে তুলে ধরা হলো—

কবিতাটির অনুবাদ নিম্নরূপ :

জগৎ সৃষ্টির সূচনা থেকে
সৃষ্টিকর্তা নিযুক্ত করে রেখেছেন
তাঁর মহান বাণী-বিশ্বাসের প্রচারক,
সুদূর পশ্চিমে তাঁর জন্ম,

এবং তিনি গ্রহণ করেন ৩০ পারায় বিভক্ত পবিত্র কিতাব

সমগ্র সৃষ্টিকে পথ দেখাতে,
সব শাসকের অধিপতি
সব পুণ্যাত্মার নেতা,
আসমান থেকে সাহায্য নিয়ে
নিজ জাতিকে রক্ষা করেন।

দৈনিক পাঁচ ইবাদত-প্রার্থনায়
নীরবে-নিভৃতে শান্তির কামনা করেন,
তাঁর হৃদয়-আত্মা আল্লাহর কাছে আবদ্ধ-নিবেদিত।

দরিদ্রের দুর্দশা-দুর্বিপাক দূর করে
তাদের মনে দেন শক্তি,
পাপীর অদৃশ্যকে পরখ করে
তাকে মুক্তি দেন দুরাত্মা থেকে,

বিশ্বের জন্য ক্ষমা-মার্জনা নিয়ে
সুদূর অতীত থেকে পথ চলছেন
সব রকমের মন্দ দূর করার মহাসড়কে,

তাঁর ধর্ম পরিশুদ্ধ ও সর্ব সত্য
মুহাম্মদ, মহান পবিত্র।

কবিতাগুলো ঐতিহাসিকভাবে ইসলামের সৌন্দর্যকে পৃথিবীর দিগ-দিগন্তে কতটা বিস্তৃত করেছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অসামান্য-স্বীকৃত অনুস্মারক হয়ে রয়েছে।

সম্রাট হংউওয়ের আসল নাম ঝ ইউয়ানজাং। তিনি ১৩৬৮ সালে চীনে মিং সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৩৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি চীন শাসন করেন। দীর্ঘকালীন মঙ্গোল-নেতৃত্বাধীন ইউয়ান রাজবংশের অবসান ঘটিয়ে মিং সাম্রাজ্যের যাত্রা শুরু করেছিলেন।

মিং রাজবংশের সম্রাট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পরে সম্রাট হংউও প্রাচীন ইউয়ান সাম্রাজ্যের রাজধানী খানবালিককে মিং সাম্রাজ্যের নতুন রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। সেই খানবালিক বর্তমান রাজধানী বেইজিং।

সম্রাট হংউওয়ের শাসনকাল বিভিন্নভাবে বৈপ্লবিক ছিল। তিনি চীনজুড়ে নতুন জমি ও কৃষিক্ষেত্রে বেশ উন্নয়ন করেছিলেন। কৃষকদের থেকে কর হ্রাস করেছিলেন। কৃষকদের অধিকার রক্ষাকারী নতুন আইন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যক্তিগত দাসত্ব নিষেধ করেছিলেন এবং সমাজের দরিদ্র স্তরের লোকদের অধিকৃত জমি আবার ফেরত দিয়েছিলেন।

সম্রাট হংউও ঝিজিং, নানজিং ও চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় ইউংনান, ফুজিয়ান এবং গুয়াংডংয়েও মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এ ছাড়া তাঁর শাসনামলে চীনে মুসলমানদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পায় বলে জানা যায়।

তাঁর হান্ড্রেড-ওয়ার্ড ইউলজি, ইসলাম ও মহানবী (সা.)-এর প্রশংসা ও মধ্যযুগে ইসলামের গুরুত্ব ও প্রসারের অন্যতম অনন্য উদাহরণ হয়ে রয়েছে।

কবিতাটি পাঠ করলে বোঝা যায়, সম্রাট হংউও ইসলাম ও মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি কতটা বিমুগ্ধ ও সম্মোহিত ছিলেন। তবে তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে ইতিহাসের গ্রন্থগুলোতে নিশ্চিত কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।

সম্রাট হংউওয়ের কবিতাটির বিভিন্ন লিপি আজও নানজিংয়ের বিভিন্ন মসজিদে সংরক্ষিত রয়েছে। মিং শাসনামলে চীনের ওপর ইসলামের প্রভাবের এটি বৃহত্তর এক নিদর্শন।

রাজবংশের গোড়ার দিকে, এমনকি সুদূর চীনের কোণে কোণে ইসলামের প্রভাব-রূপের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারকাংশ হয়ে দীপ্তি ছড়াচ্ছে।

দ্য মুসলিম ভাইব অবলম্বনে
লেখক : ইমাম ও খতিব, মসজিদুল আবরার বারইয়ারহাট পৌরসভা, চট্টগ্রাম।

নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য: