IQNA

0:01 - March 13, 2020
সংবাদ: 2610403
তেহরান (ইকনা)- করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক ক্ষতি জনসাধারণের স্বাস্থ্যঝুঁকির চেয়ে বেশি। যদি ভাইরাসটি আপনার জীবনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে, তাহলে সম্ভবত আপনার কাজে যাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে, আপনি চাকরি হারাতে পারেন বা আপনার ব্যবসায় দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টে এক বিশ্লেষণে এমনটাই লিখেছেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিশেষজ্ঞ এবং যুক্তরাজ্য: মেনা হাবের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ওমর হাসান।

যদি সরকারগুলো পদক্ষেপ না নেয় তাহলে চলতি সপ্তাহে শেয়ারবাজার থেকে যে শত শত কোটি ডলার উধাও হলো সেটি কেবল শুরু মাত্র। আর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি পরিস্থিতি সামাল দিতে এভাবে হোঁচট খেতে থাকেন, তাহলে তার পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। বিরোধী শিবির বিশেষ করে জো বাইডেন কভিড-19 কে ট্রাম্পের একটি দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, একইসঙ্গে আমেরিকার প্রয়োজনের সময়ে ‘অবিচল, আশ্বস্ত’ নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

বিশ্বজুড়ে কভিড-19 এ মৃত্যু হওয়া ৪৭১৭ জনের মধ্যে ৩১ জন যুক্তরাষ্ট্রের। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে এটা লাখ লাখ পঙ্গু করে দেবে; বিশেষ করে এই মহামারির কারণে শেয়ারবাজারে ব্যাপক ঝড় ‍উঠেছে, রাশিয়া এবং সৌদি আরবের মধ্যে তেলযুদ্ধ এবং সিরিয়ায় একটি সত্যিকারের যুদ্ধ সম্ভাব্য অভিবাসন সংকটকে ঘনীভূত করেছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে যে গাঁথুনি ছিল তা করোনাভাইরাসের কারণে খুলে গেছে। তাই স্টার্টআপস এবং খনির মতো ক্রমবর্ধমান ব্যবসাগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।

ভাইরাসটির সঙ্গে লড়াই করার মতোই গুরুত্বপূর্ণ বা এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মহামারির আতঙ্ক থেকে আমাদের অর্থনীতিগুলোকে প্রতিষেধক দেয়া। মানুষের দুর্ভোগ অসুস্থতা এবং মৃত্যুর আকারে আসতে পারে। তবে বিল পরিশোধ করতে না পারা বা বাড়ি হারানোর মধ্য দিয়েও একই ধরনের অভিজ্ঞতা হতে পারে।

সাপ্লাই চেইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পণ্য বা প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাবে বেশি প্রভাব পড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোতে। চীনে কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে দেশে উৎপাদনের আউটপুট পরিমাপের সূচক পারচেজিং ম্যানেজার’স ইনডেক্স রেকর্ড মাত্রায় কমে গেছে। চীন বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ এবং বিশ্ব উত্পাদন ব্যবস্থার এক তৃতীয়াংশই দেশটি থেকে আসে, তাই হোয়াইট হাউজ এবং বেইজিংয়ের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধের মধ্যেও চীনের সমস্যা সবার সমস্যা।

সরকারগুলো এটাকে অর্থনৈতিক নয়, বরং স্বাস্থ্যগত সংকট হিসেবে দেখছে যা এসব বিষয় আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। প্রকৃত মহামারিটি ছড়িয়ে যাওয়ার আগেই অর্থনীতিবিদদের উচিত চিকিত্সকদের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেয়া।

ইতালিতে মন্দা হবে না তা কল্পনা করা কঠিন (বিশ্বের নবম বৃহত্তম অর্থনীতি এখন অবরুদ্ধ)। ইউরোপ এবং এর বৃহত্তম বাণিজ্যক অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রও প্রভাবিত হবে না সেটিও কল্পনা করা কঠিন। আর ১২ বছর আগে সবশেষ অর্থনৈতিক মন্দার সময়ের চেয়ে দ্রুত ও কঠোরভাবে সরকারগুলো পদক্ষেপ না নিলে তা বৈশ্বিক মন্দার কারণ হয়ে ওঠাটাও অসম্ভব নয়।

এবার অনেক বেশি হারানোর আছে, কারণ পশ্চিমা দেশগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করার একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা রয়েছে এবং ট্রাম্প যে বাণিজ্যিক নীতি গ্রহণ করেছেন তাতে আগ্রাসী বাণিজ্যিক নীতি থেকে দূরে থাকার কথা বলা হয়েছে। যদিও ভাইরাসটির অর্থনৈতিক ও প্রাণহানির চাপ বহন করেছে চীন, তবে ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রেরও কম হবে না এবং কোনও কূল-কিনারা ছাড়াই ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

করোনাভাইরাসের বিস্তারের সময়ের সঙ্গে অনেকটা মিল রেখে, শুরু হয়েছে রাশিয়া-সৌদি তেলযুদ্ধ। সাময়িক সময়ের জন্য হলেও তেলের দাম ৩০ শতাংশ কমে গেলে তার জের টানতে হবে মস্কো ও রিয়াদ উভয়কেই। কিন্তু এসময় ‍যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়েও খুব একটা লাভবান হতে পারবে না বরং তেলের দাম এতটা কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া, চাকরি চলে যাওয়া এবং এমনকি রাজ্য পর্যায়ে আর্থিক মন্দা দেখা দিতে পারে।

করোনার ধাক্কা থেকে বাঁচতে ট্রাম্প কর সংক্রান্ত যে প্রস্তাবনা ঘোষণা করেছেন, তাতে চাকরিদাতা ও চাকরিজীবী উভয়পক্ষই টিকে থাকার সুযোগ থাকছে। এদিকে একটি ‘করোনাভাইরাস বাজেট’ উন্মোচন করেছেন যুক্তরাজ্যের অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনক। তবে এই নতুন ফ্যাক্টরটি কীভাবে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার পরিবর্তন ঘটাবে তা সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে চাইলে সবাই আরও বড় পরিকল্পনা করতে হবে।

এটা করোনাভাইরাস, তেলের দাম বা বৈশ্বিক অর্থনীতির চেয়ে বেশি কিছু। এটা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়। গত ১০ বছর ধরে এর কেন্দ্রস্থল ছিল সিরিয়া। এক দশক ধরে সংঘাতের পর এই পরোক্ষ যুদ্ধ এখন অর্থনৈতিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে।

আরও অনেকের সঙ্গে সিরিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের অপ্রাসঙ্গিকতা প্রত্যক্ষ করেছে রাশিয়া ও চীনের মতো উদীয়মান পরাশক্তি। তারা এখন সত্যিকারের একটি বহু-মেরুর বিশ্ব তৈরিতে তাদের ভিশন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ওপেকভুক্ত দেশগুলোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরব যাতে বৈশ্বিক তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সেজন্য বিশ্ববাজার এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে নেয়ার চেষ্টা করছে রাশিয়া ও চীন।

এমন পরিস্থিতির সঙ্গে টিকে থাকতে হলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অন্যদের তাদের বড় এবং ছোট ব্যবসাকে রক্ষা করতে হবে এবং নতুন অর্থনৈতিক বিশ্বব্যবস্থাকে অস্বীকার না করে বরং উপকৃত হওয়ার সুযোগ সন্ধান করতে হবে। এই পরিবর্তনগুলো উপেক্ষা করা যেকোনো ফ্লু মহামারির চেয়েও ক্ষতিকর হবে।

সূত্র: rtvonline

নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য: