IQNA

0:18 - February 04, 2020
সংবাদ: 2610167
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: এ বছর ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ৪১ তম বিজয়-বার্ষিকী এমন সময় পালন করা হচ্ছে যখন একই দিনে পালন করা হচ্ছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবেরই অন্যতম সফল কৃতি-সন্তান, বর্তমান যুগের মালেক আশতার নামে খ্যাত মহান বিপ্লবী সেনাপতি শহীদ কাসেম সোলাইমানির শাহাদতের চল্লিশা।

বার্তা সংস্থা ইকনা'র রিপোর্ট: শহীদ জেনারেল কাসেম সোলাইমানি ইরানের ইসলামী বিপ্লবেরই এক মহাসাফল্যের নিদর্শন। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের সফল এই মহানায়কের মৃত্যুতে অশ্রু বিসর্জন করেছেন বিশ্বের কোটি কোটি মুক্তিকামী মানুষ। কেবল ইরান ও ইরাকের প্রায় এক কোটি মানুষ তার শোক-সমাবেশে যোগ দিয়েছেন এবং ইরানে তার জানাজায় অংশ নিয়েছেন অন্তত ৫০ লাখ শোকার্ত জনতা। স্মরণকালের ইতিহাসে এত বড় জানাজা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনির মৃত্যুর পর আর দেখা যায়নি। ইরানে খাটি ইসলামী বিপ্লব হওয়ার কারণেই কাসেম সোলাইমানির মত খোদাভীরু ও অকুতভয় মহান সেনাপতির আবির্ভাব ঘটা সম্ভব হয়েছে। মহান আল্লাহ কাসেম সোলাইমানিকে বদর ও অহুদের শহীদ এবং কারবালার শহীদদের সমপর্যায়ের মর্যাদা দান করুন পরকালে।

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যে উজ্জীবিত হয়েছে বিশ্বের মুক্তিকামী জাতিগুলো। ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, কাশ্মির, বসনিয়া, মিশর, আলজেরিয়া, তিউনিশিয়া ও লেবাননের মুক্তি আন্দোলনগুলোর সাফল্যে এই মহান বিপ্লবের প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও লেবাননের জনপ্রিয় প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর সাফল্যে প্রায় প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছে ইসলামী বিপ্লবের দেশ ইরান। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর পরই এ বিপ্লবের মহান রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনীর আহ্বানে মুসলমানদের প্রথম কেবলা আলআকসা মসজিদসহ ফিলিস্তিনিকে মুক্ত করার লক্ষ্যে বিশ্বের মুক্তিকামী জনগণকে জাগিয়ে তোলার জন্য প্রতি বছর পালন করা হচ্ছে বিশ্ব-কুদস দিবস। এ দিবস ইসলামী ঐক্য জোরদারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে অংকুরেই বিনষ্ট করার জন্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ইরাকের সাদ্দাম সরকারকে দিয়ে ইরানের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল ৮ বছরের দীর্ঘ এক যুদ্ধ। এ ছাড়াও ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় নানা অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু এ যুদ্ধ এবং অবরোধ আর নিষেধাজ্ঞাগুলো সামরিক, অর্থনৈতিক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কৃষি ও চিকিৎসা খাতসহ নানা খাতে ইরানকে স্বনির্ভর করে তুলেছে।

ইরানের সংগ্রামী জাতি ইসলাম ও ঈমানের বলে বলীয়ান হওয়াতেই বিশ্বের সবগুলো সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের দোসর সরকারগুলোর সহায়হাতাপুষ্ট সাদ্দাম শেষ পর্যন্ত ইরানের কাছে নতজানু হতে বাধ্য হয়েছিল।

ইরান মুসলিম বিশ্বের কাছে আবারও ইসলামী সভ্যতার এক নতুন রূপরেখা ও আদর্শ তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। ইরান রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এটা দেখাতে পেরেছে যে ইসলামের ভিত্তিতেই ন্যায়বিচার-ভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। অন্যদিকে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ইরান প্রমাণ করেছে যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের পরাশক্তিগুলোর তাবেদারি না করেও এবং ইসলামের ছায়াতলে থেকেই স্বাধীন থাকা যায়। বিশ্বের মজলুম মানবতা ও জাতিগুলোর প্রতি ইসলামী ইরানের সমর্থন ও সহায়তা বিশ্বব্যাপী ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। তাই পশ্চিমা শক্তিগুলো ইসলাম ও ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিরুদ্ধে শুরু করেছে সর্বাত্মক সাংস্কৃতিক ও প্রচারণার যুদ্ধ। এরই আওতায় প্রায়ই ইসলাম ও পবিত্র কুরআনের অবমাননার পদক্ষেপ নেয় পশ্চিমা সরকারগুলোর মদদপুষ্ট এক শ্রেণীর কুলাঙ্গার নেতা বা বুদ্ধিজীবি।

মূর্তাদ সালমান রুশদির স্যাটানিক ভার্সেস বইটি ছিল ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে ইসলামের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক ক্রুসেডের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনি মুসলিম নামধারী মূর্তাদ রুশদির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার ফতোয়া দিয়ে এ জাতীয় আগ্রাসনের পথ অনেকাংশেই প্রতিহত করেছেন। ইমাম খোমেনী সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বশেষ নেতা মিখাইল গর্বাচেভের কাছে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে ইসলামী দাওয়াতের ইতিহাসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছিলেন আধুনিক এই যুগে। তিনি এই দাওয়াতে বলেছিলেন, সোভিয়েতদের মূল সমস্যা কেবল অর্থনৈতিক নয়, খোদাবিমুখতা ও নাস্তিকতাই তাদের প্রধান সমস্যা। অন্যদিকে ইমাম খোমেনি মার্কিন নেতৃত্বাধীন ইসলাম সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। মার্কিন নেতৃত্বাধীন এই ইসলাম কেবল মুসলমানদের মধ্যে শিয়া-সুন্নি বিরোধসহ নানা ধরনের ধর্মান্ধতা উস্কে দিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এভাবে ইরানের ইসলামী বিপ্লব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসলামের সত্যিকারের রূপ ও ইসলামী ঐক্যের গুরুত্ব এবং ইসলামের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের ষড়যন্ত্রগুলোর স্বরূপ তুলে ধরছে। এসবও ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বড় সাফল্য।

আবারও ফিরে আসছি শহীদ সোলাইমানির প্রসঙ্গে। সোলাইমানিকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়ে হত্যা করেছিল মার্কিন সরকার ইরাকের রাজধানী বাগদাদ বিমানবন্দরের বাইরে। ইরান বলেছিল এর কঠোর প্রতিশোধ নেয়া হবে। এই প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী ইরাকে সর্ববৃহৎ মার্কিন ঘাঁটি আইনুল আসাদকে ১৩টি নিখুঁত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস করে দেয় ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। এই বাহিনীর কুদস ব্রিগেডের প্রধান ছিলেন শহীদ সোলাইমানি। এই ব্রিগেডের লক্ষ্য হল ফিলিস্তিন ও মুসলমানদের প্রথম কেবলাকে স্বাধীন করা। উল্লেখ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গত ৭০-৮০ বছরের মধ্যে এই প্রথম কোনো দেশ বা শক্তি সরাসরি ঘোষণা দিয়ে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালাল এবং তা ধ্বংস করতেও সক্ষম হল। ইরানের ইসলামী রাষ্ট্রই এই বিশাল কৃতিত্বের অধিকারী।

এ হামলার পর মার্কিন সরকার বুঝে গেছে যে ইরানের ওপর সরাসরি হামলা করার ক্ষমতাও আর কোনো শক্তির নেই এবং মধ্যপ্রাচ্য বা পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ভঙ্গুর কর্তৃত্ব যে কোনো সময় বালির বাঁধের মত ভেসে যেতে পারে। ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে দুর্বল বা অকেজো করার যে স্বপ্ন পশ্চিমারা দেখছিল তা এখন তাদের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের পটভূমি ও নানা সাফল্য নিয়ে আমরা আরও কথা বলব আগামী আসরগুলোতে। আশা করছি তখনও আমাদের সঙ্গ দিতে ভুলবেন না।
সূত্র:parstoday

নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য: