IQNA

লেবাননের শহীদ হিজবুল্লাহ যোদ্ধার স্ত্রী: লেবাননের জনগণ ঈমান ও আশা নিয়ে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে

22:05 - June 22, 2026
সংবাদ: 3479345
লেবাননের শহীদ হিজবুল্লাহ যোদ্ধার স্ত্রী: লেবাননের জনগণ ঈমান ও আশা নিয়ে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে
হুরা ইয়াসিন মনে করেন, আমরা সবাই সর্বাগ্রে করবালার মাকতাবের অনুসারী; এই মাকতাব আমাদেরকে শক্তি ও ধৈর্য দান করেছে। লেবাননের ত্যাগী পরিবারগুলো আজ করবালার শিক্ষার বাস্তব প্রতিচ্ছবি। জান, মাল ও সন্তান উৎসর্গ করার মাধ্যমে এবং ঈমানের শক্তিতেই আমরা বিপদ-মুসিবতে ধৈর্য ধারণ করতে পেরেছি, যাতে আল্লাহর উপর ভরসা ও আশা নিয়ে প্রতিরোধের মীরাস সংরক্ষিত হয়।

হুরা ইয়াসিন, আন্তর্জাতিক আল-কাউসার টেলিভিশন নেটওয়ার্কের পরিচিত মুখ এবং হিজবুল্লাহ যোদ্ধা শহীদ মোহাম্মদ বাকের আলী কারকীর স্ত্রী, ইকনার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে পরিবারকে সুসংহত করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা, শহীদ পরিবারে জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা, সিওনিস্ট আগ্রাসনের মুখে লেবাননের জনগণের সহনশীলতা এবং লেবাননী সমাজে প্রতিরোধের অবস্থান নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন।

 

ইকনা::আপনি আল-কাউসার নেটওয়ার্কে ‘ফিঞ্জান কাহওয়া’ অনুষ্ঠানে পরিবার ও সমাজবিষয়ক আলোচনা করেন। বর্তমানে যখন অঞ্চলটি নানা সংকট ও যুদ্ধের সম্মুখীন, তখন আপনার দৃষ্টিতে গণমাধ্যমের পরিবারগুলোর আশা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় কী ভূমিকা রয়েছে?

 

হুরা ইয়াসিন:: আজকের গণমাধ্যম আমাদের জীবনের বিশাল অংশ দখল করে নিয়েছে এবং তথ্য ও খবর পাওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এর গুরুত্বের কারণে শত্রুরা প্রতিরোধপন্থী পরিবেশে আঘাত করতে, তাদের মনোবল ভেঙে দিতে এবং তাদের মধ্যে দ্বিধা সৃষ্টির জন্য গণমাধ্যমকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে।

 

তাই গণমাধ্যমী কার্যক্রম বৃদ্ধি, এর মান উন্নয়ন এবং সঠিক দিকনির্দেশনা প্রতিরোধ শক্তি ও জনগণের মধ্যে সংহতি জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া এটি সত্যকে উন্মোচিত করতে এবং মিথ্যা বর্ণনা ও বিরোধী গণমাধ্যমকে নির্ভরযোগ্যতাহীন করতে সক্ষম।

 

গণমাধ্যম আসলে একটি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, যা হযরত যয়নব (সা.)-এর সীরাত থেকে অনুপ্রাণিত— যিনি ইতিহাসের প্রথম গণমাধ্যমকর্মী এবং করবালার ঘটনার সত্যতা উন্মোচন করেছিলেন।

 

আজ আমাদের দায়িত্ব হলো এই গণমাধ্যমী অস্ত্রকে সামরিক অস্ত্রের পাশাপাশি উম্মাহর ইস্যুতে ব্যবহার করা এবং বিশ্বের জনমত যাতে সত্যকে যেমন আছে তেমন দেখতে পায়।

 

ইকনা::আপনি এমন এক যোদ্ধার স্ত্রী যিনি নিজের শহীদ পিতার পথ অনুসরণ করে প্রতিরোধের পথে শাহাদাত বরণ করেছেন। আপনার শহীদ স্বামীর ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক বৈশিষ্ট্য কী ছিল এবং তাঁর জীবন থেকে যুবসমাজের জন্য কী শিক্ষা রয়েছে?

 

হুরা ইয়াসিন:: শহীদ কারকী অনেক বিষয়ে তাঁর পিতার আয়না ও ধারাবাহিকতা ছিলেন। যেকোনো কাজ করার সময় তিনি বলতেন, “হাজী এভাবেই পছন্দ করতেন” অথবা “তিনি এভাবেই চাইতেন”।

 

তিনি নামাজের প্রতি অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন এবং মুস্তাহাব ইবাদতগুলোও নিয়মিত পালন করতেন। তাহাজ্জুদ, দোয়া ও মুনাজাতের প্রতি তাঁর বিশেষ মনোযোগ ছিল। কুরআনের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল এবং প্রতিটি সুযোগে আল্লাহর কালাম তিলাওয়াত করতেন।

 

মানুষের সাথে আচরণে তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্র ছিলেন। ছোট-বড় সবার সাথে সম্মানের সাথে কথা বলতেন এবং সবসময় মানুষের কাজ সহজ করে দিতেন ও তাদের প্রয়োজন পূরণের চেষ্টা করতেন।

 

পিতার পর তিনি তাঁর পরিবারের জন্য পিতা ও আশ্রয়স্থলের ভূমিকা পালন করতেন।

 

ইকনা:: শহীদ কারকীর পরিবার লেবাননে প্রতিরোধের পরিচিত পরিবারগুলোর একটি। এমন পরিবারে জীবনযাপন আজকের প্রজন্মের জন্য কী দায়িত্ব ও বার্তা বহন করে?

 

হুরা ইয়াসিন:: আমরা সবাই সর্বাগ্রে করবালার মাকতাবের অনুসারী; এই মাকতাব আমাদেরকে শক্তি, আকীদা, ইয়াকীন, ঈমান, ধৈর্য ও সহনশীলতা দান করেছে।

 

আমাদের ত্যাগী পরিবারগুলো আজ করবালার শিক্ষার বাস্তব প্রতিচ্ছবি— জান, মাল ও সন্তান উৎসর্গের দিক থেকে। বিপদে আমাদের ধৈর্য এই মীরাস সংরক্ষণে সহায়ক।

 

শহীদদের গুণাবলী বর্ণনা, তাঁদের অর্জন স্মরণ, তাঁদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং প্রতিরোধের প্রতি ভালোবাসার ভিত্তিতে প্রজন্ম গঠন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই প্রতিরোধ আমাদের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষার রহস্য এবং আমাদের অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা। আজ ময়দান হক ও বাতিলের মধ্যে অস্তিত্বের লড়াইয়ের ময়দান।

 

ইকনা:: লেবাননের জনগণ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধ থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক সংকট পর্যন্ত অসংখ্য কষ্ট সহ্য করেছে। আপনার মতে, লেবাননী সমাজের এই অসাধারণ সহনশীলতা ও দৃঢ়তার রহস্য কী?

 

হুরা ইয়াসিন:: এই সব সহ্য ও দৃঢ়তার মূলে, আল্লাহর প্রতি ঈমান ও তাঁর ইচ্ছায় আত্মসমর্পণের পর, ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মাকতাব রয়েছে।

 

এছাড়া যারা প্রতিরোধের পরিবেশে আমাদের লালন-পালনে যত্নবান ছিলেন, বিশেষ করে মহান শহীদ সাইয়েদ হাসান নাসরুল্লাহ, তিনি আমাদের জন্য সর্বোত্তম সহায়ক ও সমর্থক ছিলেন— তাঁর সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে, যাঁরা এই ত্যাগী জনগণের অনুগত সন্তান।

 

আজও আমরা শহীদ পরিবার, আহত ও ঘরছাড়া মানুষের মধ্যে ধৈর্য ও অবিচলতার সুন্দরতম দৃষ্টান্ত দেখতে পাই। কারণ এই সমাজের শিকড় সুস্থ ও মজবুত।

 

আমরা সেই বৃক্ষের মতো, যার শিকড় মাটিতে সুদৃঢ় এবং শাখা আকাশে। শহীদরা সম্মান লাভের জন্য একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।

 

ইকনা:: আপনি লেবাননের জনগণের প্রতিরোধের প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতা সরাসরি দেখেছেন। জনগণ ও প্রতিরোধের মধ্যে এই গভীর বন্ধন কীভাবে গড়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতে লেবানন ও অঞ্চলের জন্য এর কী ভূমিকা থাকবে?

 

হুরা ইয়াসিন:: আমাদের প্রতিরোধ বাইরে থেকে আমদানি করা নয় এবং জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। বরং এটি দক্ষিণ, বেকা ও সব প্রতিরোধ পরিবারের ঘর থেকে উঠে এসেছে। আমাদের যুবকরা এমন মায়েদের কোল থেকে বেড়ে উঠেছে যাঁরা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। সামনের সারিতে যোদ্ধাদের সমর্থনে তাঁরা সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় কোনো চেষ্টা করতে কার্পণ্য করেননি।

 

আমাদের প্রতিরোধ একটি অস্তিত্বগত কর্মকাণ্ড, যা ভূমি ও সম্মান রক্ষার স্বাভাবিক অনুভূতি থেকে উৎসারিত। তাই এটি আমাদের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত এবং আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এটাকে উত্তরাধিকার হিসেবে লাভ করি। আজও এর সর্বোত্তম উদাহরণ হলো পিতা ও পুত্র উভয়ের শাহাদাত।

 

প্রতিরোধের এই দৃঢ়তা ও বিজয়ই এর বৈধতা প্রদান করেছে। যখন সিওনিস্ট আগ্রাসনের সময় “চোখ পেরেককে সহ্য করতে পারবে না” শ্লোগান দেওয়া হতো, তখন কিছু ঈমানদার যুবক সাধারণ কলাশনিকভ নিয়ে, যাঁদের মধ্যে হাজি আবুল ফজলও ছিলেন, উঠে দাঁড়িয়েছিলেন এবং বলেছিলেন “চোখই পেরেককে উপড়ে ফেলবে”। ফলে ২০০০ সালের মুক্তি, ২০০৬ সালের জুলাই বিজয়, জুরুদ যুদ্ধে দ্বিতীয় মুক্তি এবং আজ পর্যন্ত সবকিছু বাস্তবায়িত হয়েছে।

 

আজও প্রতিরোধের নতুন বিজয় প্রমাণ করে যে, আল্লাহর উপর ভরসা ও তাঁর দ্বীনের সাহায্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী ও শক্তিকেও পরাজিত করা সম্ভব। এটি আল্লাহর প্রতিশ্রুতি: **“হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য করো, তিনি তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ় করবেন”** (সূরা মুহাম্মদ: ৭)। তাহলে আমরা কীভাবে বিজয়ী হব না?4359422#

captcha