ইকনা’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারবালার ঘটনার তেরো শতাব্দীরও বেশি সময় পরেও, মহররমের প্রথম দশক দক্ষিণ এশিয়ার শহর ও গ্রামগুলোকে পুরোপুরি বদলে দেয়। রাস্তাঘাট কালো পোশাক পরা শোকার্ত মানুষে ভরে যায়। চতুর্মুখী সড়ক ও গলিতে অস্থায়ী পানি ও শরবত বিতরণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে। লাউডস্পিকারে বাজতে থাকে মর্সিয়া, যা ইসলামের নবীর নাতি ইমাম হুসাইন (আ.)-এর জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো বর্ণনা করে। পতাকা, আলম, আচারিক প্রতীক ও ধর্মীয় স্থানের মডেল বহনকারী আজাদারী শোভাযাত্রা শহরের জনবহুল এলাকা দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে।
লখনউয়ের পুরনো পাড়া থেকে শুরু করে করাচির রাস্তা, ঢাকার ঐতিহাসিক হুসাইনী দালান থেকে কাঠমান্ডুর মুসলিম সমাবেশ— দক্ষিণ এশিয়ায় মহররম এখনও অঞ্চলের সবচেয়ে দৃশ্যমান ও প্রভাবশালী ধর্মীয় আচারগুলোর একটি।

কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় মহররম শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সাহিত্যিক ঐতিহ্য, সম্মিলিত পরিচয় সংরক্ষণের মাধ্যম এবং অনেকের কাছে ন্যায়বিচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের নৈতিক ঘোষণায় পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় দেখা গেছে, আশুরার আচার-অনুষ্ঠান শুধু অতীতের স্মরণ নয়, বরং সম্মিলিত পরিচয় পুনর্নির্মাণ, জনসমাজে সম্প্রদায়ের অবস্থান নির্ধারণ এবং স্থানীয় অভিজ্ঞতাকে বৈশ্বিক আত্মত্যাগ ও ফদাকারীর আখ্যানের সাথে যুক্ত করার এক শক্তিশালী হাতিয়ার।
একটি অমর ট্র্যাজেডি
মহররমের আচার-অনুষ্ঠানের কেন্দ্রে রয়েছে একটি আখ্যান, যা বিশ্বের মুসলিমদের কাছে পরিচিত। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে ইমাম হুসাইন ইবনে আলী (আ.) তাঁর পরিবার ও অল্প কয়েকজন সঙ্গীর সাথে কারবালায় ইয়াযীদ ইবনে মু‘আবিয়ার কাছে বাই‘আত করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে শাহাদাতবরণ করেন।
শিয়াদের কাছে কারবালা নৈতিক প্রতিরোধ ও জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। অনেক সুন্নি মুসলিমের কাছেও ইমাম হুসাইন (আ.) একজন মহান ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব, যাঁর আত্মত্যাগ সাহসিকতা ও নৈতিক নীতির প্রতি অবিচল থাকার উদাহরণ।
দক্ষিণ এশিয়ায় কারবালা ঐতিহাসিক ঘটনার চেয়েও অনেক বড় কিছু হয়ে উঠেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থানীয় সমাজ এই মর্মান্তিক ঘটনাকে স্মরণ করার নিজস্ব পদ্ধতি তৈরি করেছে। ইরানি সাংস্কৃতিক প্রভাব ভারতীয় শিল্প ঐতিহ্যের সাথে মিশে গেছে। শিয়া শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় অপূর্ব আজাদারী স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। কবিরা মর্সিয়া রচনা করেছেন, শিল্পীরা প্রতীকী নির্মাণ তৈরি করেছেন। ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় এক অনন্য মহররম সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে, যা একবিংশ শতাব্দীতেও জীবন্ত ও গতিশীল।

লখনউ: দক্ষিণ এশিয়ার আশুরা সংস্কৃতির রাজধানী
দক্ষিণ এশিয়ার সকল শহরের মধ্যে লখনউ-এর অবস্থান অনন্য। অযোধ্যা (আওয়াদ) অঞ্চলের শিয়া শাসকগণ অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে কারবালার স্মৃতিকে জনপ্রিয় ও ব্যাপক সংস্কৃতিতে রূপান্তরিত করেন। বিশাল বারা ইমামবাড়া এখনও মহররমের প্রধান কেন্দ্র।
তাজিয়া: দক্ষিণ এশিয়ার অনন্য উদ্ভাবন
তাজিয়া দক্ষিণ এশিয়ার মহররম সংস্কৃতির সবচেয়ে স্বতন্ত্র প্রতীক। এটি কারবালায় ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কবরের প্রতীকী নকশা, যা কাঠ, বাঁশ, কাগজ, ধাতু, কাচ ও নানা সাজসজ্জায় তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে হিন্দু কারিগররাও তাজিয়া নির্মাণে অংশ নেন।
পাকিস্তান: জাতীয় পর্যায়ে আশুরা
করাচি, লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি, মুলতান ও পেশাওয়ারে প্রতি বছর বিশাল আজাদারী শোভাযাত্রা হয়, যাতে কয়েক হাজার থেকে লক্ষাধিক মানুষ অংশ নেয়।

বাংলাদেশের হুসাইনী দালান
ঢাকার হুসাইনী দালান বাংলাদেশের প্রধান আজাদারী কেন্দ্র। মোগল আমলে নির্মিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মহররমের কেন্দ্র হয়ে আছে।
নেপালে মহররম: শান্ত কিন্তু অব্যাহত ঐতিহ্য
কাঠমান্ডু, বীরগঞ্জ ও নেপালগঞ্জে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে মহররমের আচার-অনুষ্ঠান চলমান রয়েছে।
পানি, নজর ও কারবালার তৃষ্ণার স্মরণ
মহররমের সবচেয়ে ব্যাপক প্রথা হলো ‘সাবিল’ — রাস্তায় বিনামূল্যে পানি, দুধ, শরবত বিতরণ। এটি কারবালার তৃষ্ণার স্মরণ।
ডিজিটাল যুগে মহররম
আজ মজলিসগুলো অনলাইনে লাইভ সম্প্রচারিত হয়, নৌহা ও বক্তৃতা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
কেন মহররম এখনও গুরুত্বপূর্ণ?
দক্ষিণ এশিয়ায় মহররমের অব্যাহত উপস্থিতি কারবালার আখ্যানের অমর শক্তির প্রমাণ। এখানে ধর্ম, জাতি ও রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য সত্ত্বেও মানুষ ন্যায়বিচার, আত্মত্যাগ, নৈতিক সাহসিকতা ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের মূল্যবোধে এক হয়।

প্রতি বছর কালো পতাকা উড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলোতে কারবালার কাহিনি আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে। এটি আর শুধু অতীতের গল্প নয়; বরং নৈতিকতা, পরিচয়, ন্যায়বিচার ও জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অব্যাহত সংলাপ।
একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে মহররম এই সত্যের স্মারক যে, কিছু আখ্যান কালের গভীরতার কারণে নয়, বরং নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষমতার কারণে জীবন্ত থাকে। ইমাম হুসাইন (আ.) ও কারবালা সেই আখ্যানগুলোর অন্যতম, যা তেরো শতাব্দী পরেও দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের হৃদয়ে বিরাজমান।